যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরেও গাজায় হামলা থামেনি। হামাসের প্রধান আলোচক খলিল আল-হাইয়া এবার তাঁর চতুর্থ সন্তানকে হারালেন। পাশাপাশি ৭২ হাজার নিহতের হিসাব, অমানবিক অবরোধের বাস্তবতা এবং 'যুদ্ধবিরতি' নামক প্রতারণা সব মিলিয়ে কেমন আছে গাজাবাসীরা, পূর্ণ চিত্র দেখুন আরটিএনএন এর বিশেষ প্রতিবেদনে।
গাজায় আরও একদিন। আরও একটি হামলা। আরও একটি পরিবার যারা তাদের প্রিয়জনকে হারাল। কিন্তু বুধবারের (৬ মে) এই মৃত্যুটি ছিল একটু আলাদা কারণ যে পিতা তাঁর পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ পেলেন, তিনি আগেও তিনবার এই শোক সহ্য করেছেন।

গাজা সিটির দারাজ এলাকায় ইসরায়েলি বোমায় প্রাণ হারালেন আজ্জাম খলিল আল-হাইয়া। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ্জাম হামাসের এলিট নুখবা বাহিনীর সদস্য ছিলেন — সেই বিশেষ বাহিনী যারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। একই হামলায় হামজা আল-শারবাসি নামে আরেকজন নিহত এবং কমপক্ষে নয়জন আহত হন।
৬ মে বুধবার আজ্জামের মৃত্যু ছিল গাজায় সেদিনের একমাত্র ট্র্যাজেডি নয়। উত্তর গাজার জেইতুন এলাকায় হামলায় একটি পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন — তারা সালাহ আল-দিন মসজিদের কাছে একটি তাঁবু স্থাপন করতে যাচ্ছিলেন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে হামাসের মাদকবিরোধী পুলিশ প্রধান নাসিম আল-কালাজানি তাঁর গাড়িতে বোমার আঘাতে নিহত হন, আহত হন আরও ১৭ জন।
'যুদ্ধবিরতির' নামে প্রতিদিন মানুষ মরছে
অক্টোবর ২০২৫ সালে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু এমএসএফ, অক্সফ্যাম, ও ইউএনআরডব্লিউএর রিপোর্ট বলছে, সেই 'যুদ্ধবিরতি' কেবল নামেই। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত অন্তত ৮৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি হামলায়। প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুটি শিশু হতাহতের শিকার হচ্ছে।
খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ছাড়া বেঁচে থাকার লড়াই
জাতিসংঘের খাদ্য পর্যবেক্ষক সংস্থা IPC জানিয়েছে, গাজার ১৬ লাখেরও বেশি মানুষ এখনও 'সংকটমাত্রা' ক্ষুধায় ভুগছেন। আগস্ট ২০২৫ সালে গাজা গভর্নরেটে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষিত হয়েছিল। অক্সফ্যাম জানিয়েছে, মাত্র তাদের কাছেই ২০ লাখ ডলার মূল্যের ত্রাণ ও পানি পরিশোধন সরঞ্জাম গাজার সীমান্তে আটকে আছে, কারণ ইসরায়েল প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না।
ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফ্ল্যাশ আপিলে ৩৬ লাখ মানুষের জন্য ৪ বিলিয়ন ডলারের ত্রাণ চাওয়া হয়েছে। এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ১০ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। একদিকে বোমা, অন্যদিকে ক্ষুধা, গাজাবাসী এক দ্বিমুখী মৃত্যুর মধ্যে বন্দি।
ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনা ও আলোচনার ভবিষ্যৎ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিধি টোনি ব্লেয়ার সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে "উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি" হয়েছে। গাজা প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটি (NCAG) গঠিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) তাদের মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে।
তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে আলোচনা থমকে আছে। মিশর, কাতার ও তুরস্ক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ইরান খলিল আল-হাইয়াকে সমর্থন করছে হামাসের শীর্ষ পদের জন্য, আর মিশর চায় নেতৃত্ব গাজায় ভিত্তিক থাকুক। এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই আজ্জামের মৃত্যু হামাসের প্রধান আলোচককে আলোচনার টেবিল থেকে বিচ্যুত করার আরেকটি প্রচেষ্টা কিনা, প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।

সংখ্যার ভেতরে লুকানো মানুষের গল্প
সংখ্যাগুলো বিশাল: ৭২,৩০০ নিহত। ১,৭২,০০০ আহত। ৮,০০০ মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে। কিন্তু এর প্রতিটির পেছনে একটি পরিবার আছে — ঠিক যেমন খলিল আল-হাইয়ার পরিবারের মতো। NPR-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেইত লাহিয়ার আবু নাসের পরিবারের কথা, যেখানে একটিমাত্র হামলায় একটি বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ১৩২ জন পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছিলেন ২০২৪ সালে। এখন গাজায় মাত্র একটি কার্যকর খননযন্ত্র আছে মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ জানিয়েছে, গাজায় গণহত্যা সংজ্ঞার চারটি মানদণ্ডের মধ্যে চারটিই পূরণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলার পর্যালোচনা চলছে। ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, এটি হামাসকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক অভিযান।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!