কেন ভোটাধিকার হারালো পশ্চিমবঙ্গের লাখো মুসলিম?
ভারতে ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা রাজ্যের ১০ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। উত্তরপ্রদেশের পর ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে এই রাজ্যেই মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যা রয়েছে।   ছবি: ডয়েচে ভেলে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদের পর প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ মুসলিম ভোটার হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখের মধ্যে এই বাদ পড়া ভোটারের হার প্রায় ১২ শতাংশ। ইসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লাখ নাম ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ হিসেবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাকি প্রায় ৩০ লাখ ভোটারকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের শুনানি শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতিতে অনেক ভোটারই চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ৭৩ বছর বয়সী নবীজান মণ্ডল, যিনি গত পাঁচ দশক ধরে নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছিলেন, এবার তার নাম ভোটার তালিকায় না পেয়ে বিস্মিত হন। তার অভিযোগ, নামের ভিন্নতা ও নথিপত্রের অসামঞ্জস্যের কারণে তার ভোটাধিকার বাতিল করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা ও মালদা জেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই হার উল্লেখযোগ্য।

একাধিক নাগরিক জানান, নামের বানানগত ভুল, ডাকনাম ও সরকারি নথিতে নামের অমিল, এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জটিলতার কারণে অনেকের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ভুয়া, মৃত বা দ্বৈত ভোটারদের চিহ্নিত করে তালিকা হালনাগাদ করা। কমিশন বলছে, এটি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করছে, এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোটাধিকার অনুপাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি একটি “পরিকল্পিত বঞ্চনার” অংশ হতে পারে।

এদিকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও জানিয়েছে, যেসব ভোটার ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়ায় আছেন, তারা আপাতত ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। তবে আদালত সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং ভোটার তালিকা প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে ‘গোপন উদ্দেশ্য’ 

বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দল ও গবেষকদের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তারা মনে করেন, এই প্রক্রিয়ার সময়কাল, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং ফলাফল আগেই নির্ধারিত। এটিকে ‘গোপন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মিশন বলেই দাবি বিরোধীদের।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০১৪ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটাররা মূলত বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে পক্ষপাতের অভিযোগও সামনে এসেছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা আবেদনে অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে না। সম্প্রতি এক জনসভায় তিনি বলেন, বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গে বেছে বেছে এসআইআর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে। তার দাবি, গণতান্ত্রিকভাবে জেতার পরিবর্তে ভোট ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে বিজেপি দাবি করেছে, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ও সন্দেহভাজন ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। দলটি প্রায়ই ‘বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরে।

কোলকাতার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সাবার ইনস্টিটিউট’-এর গবেষক সাবির আহমেদ বলেন, ভোটার তালিকা সংশোধন সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। তার মতে, “এত দ্রুততার পেছনে উদ্দেশ্য থাকতে পারে—এমন প্রশ্ন উঠছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় জ্ঞানহীন পর্যবেক্ষকদের অন্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছে এবং তালিকা প্রকাশের সময় স্বচ্ছতার অভাব ছিল।

প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়, নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের মধ্যে মুসলিমদের অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া ইমাম অ্যাসোসিয়েশন’-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখা এই পরিস্থিতিতে হেল্পলাইন চালু করেছে, যাতে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটাররা আইনি সহায়তা পেতে পারেন।

সংগঠনের নেতা মোহাম্মদ বাকি বিল্লাহ বলেন, “যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা থাকা জরুরি।”

অন্যদিকে শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, এই প্রক্রিয়ায় নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ তাদের নথিপত্র জটিলতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তিনি বলেন, বিয়ের পর নারীদের নাম ও ঠিকানা পরিবর্তন, ডাকনাম ব্যবহার এবং বিভিন্ন নথিতে বানানের ভিন্নতার কারণে অনেক নারী ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন।

এদিকে সাধারণ ভোটাররাও চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। মুর্শিদাবাদের এক ভোটার শহিদুল ইসলাম বলেন, সব নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এখানেই জন্মেছি, এখানেই থাকি—তবুও আমাদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এসআইআর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি, আনন্দবাজার, ডয়েচে ভেলে