যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।   ছবি: সংগৃহীত

আজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। আর এই আলোচনাকে ঘিরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন কূটনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ৪৮ বছরের মধ্যে এবারই প্রথমবারের মতো দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি আলোচনায় বসছেন। তবে হঠাৎ করে যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটার সিদ্ধান্ত কেন এই প্রশ্নটি বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামরিক কৌশল, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং দেশটির জনগণের জাতীয় ঐক্য এসব কারণেই যুদ্ধের মোড় ঘুরেছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে।

শনিবার (১১ এপ্রিল) অনুষ্ঠিতব্য এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে সামনে রেখে ইসলামাবাদে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।  শহরের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে হাজারো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ পুরোপুরি প্রস্তুত। ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছেছে। ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, যাঁর সাথে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, সুপ্রিম ন্যাশনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর, ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী আকবর আহমাদিয়ান, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোল নাসের হেম্মাতি।

বৈঠক শুরু হওয়ার আগে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বলেন, “আমাদের সদিচ্ছা আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আমাদের কোনো বিশ্বাস নেই। যদি তারা একটি প্রকৃত চুক্তির জন্য প্রস্তুত থাকে, তবে আমরা প্রস্তুত।” গালিবাফ আরও বলেন, “দুর্ভাগ্যবশত, আমেরিকানদের সঙ্গে আমাদের আলোচনার অভিজ্ঞতা সবসময় ব্যর্থতা এবং প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, আলোচনার প্রধান বিষয় হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে ট্রাম্প নিশ্চিত করেননি যে, এই আলোচনা আগামী সপ্তাহগুলোতে চলবে কি না। তিনি দাবি করেন যে, হরমুজ প্রণালি শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে আলোচনা করতে যাবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার। শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে রওনা হওয়ার সময় ভ্যান্স সাংবাদিকদের জানান, তিনি বিশ্বাস করেন যে, তেহরানের সঙ্গে আলোচনাগুলি “ইতিবাচক” হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইরান যদি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়, তবে তারা দেখবে যে আমাদের আলোচক দল মোটেও সহানুভূতিশীল নয়।”

এদিকে, গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও ইসরাইল ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, “যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত।” তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পাকিস্তানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে আগ্রাসনে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এতে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের সমর্থনে বিক্ষোভও দেখা যায়। ইউরোপ ও ন্যাটোর দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোয় যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই একা হয়ে পড়ে।

এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও তেল স্থাপনায় ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের এই সংঘাত ইরানকে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে এবং সবার নজর এখন ইসলামাবাদে।