যুক্তরাষ্ট্র, কূটনীতিবিদ, উইলিয়াম বি মাইলাম
উইলিয়াম বি মাইলাম   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মাইলাম মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের রাজধানী স্যাক্রামেন্টোতে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। বুধবার রাতে মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী মাইলামের মেয়ে এরিকা মাইলাম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোভিচের বরাতে এই খবর নিশ্চিত করেছেন।

মাইলাম ছিলেন একজন পেশাদার কূটনীতিক, যিনি ১৯৬২ সালে ইউএস ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। তিনি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের পতন এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সময় তিনি বাংলাদেশের জনগণের পাশে ছিলেন। অবসর গ্রহণের আগে তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মাইলাম ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত লাইবেরিয়ায় মার্কিন মিশন প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। তাঁর দায়িত্বকালে লাইবেরিয়ায় সাত বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

২০০১ সালের জুলাই মাসের শেষে তিনি ইউএস ফরেন সার্ভিস থেকে অবসর নেন, কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের পর তাঁকে পুনরায় ডাকা হয়। তিনি আফগানিস্তান পুনর্গঠনের জন্য বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা স্থাপনে সহায়তার কাজে নয় মাস ব্যয় করেন। লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন শার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্যও তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে মাইলাম ১৯৮১ সালে 'আউটস্ট্যান্ডিং ক্লাস ওয়ান অফিসার' হিসেবে জেমস ক্লিমেন্ট ডান পুরস্কার এবং ১৯৮৩ সালে সুপিরিয়র অনার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এছাড়া ১৯৯০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল মেরিটোরিয়াস সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯১ সালে অসাধারণ সেবার জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড পান।

শোক প্রকাশ

মুশফিকুল ফজল আনসারী এবং জন ড্যানিলোভিচ পৃথক ফেসবুক পোস্টে উইলিয়াম বি. মাইলামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে "বাংলাদেশের একজন সত্যিকারের বন্ধু" অভিহিত করে মুশফিকুল লিখেছেন, "আমি যখন ঢাকায়, তখন একটি আকস্মিক দুঃসংবাদ আমাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বিল মাইলাম মারা গেছেন... আমি শোকে স্তব্ধ এবং গভীরভাবে শোকাহত।"

তিনি বলেন, "বিল মাইলামের প্রয়াণ এক অপূরণীয় ক্ষতি। বাংলাদেশ একজন সত্যিকারের বন্ধুকে হারাল, আর আমি হারালাম একজন বিজ্ঞ পরামর্শদাতা এবং যত্নশীল অভিভাবককে। তাঁর স্মৃতি আমার যাত্রাপথে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।"

জন ড্যানিলোভিচ তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "আজ আমার বন্ধু ও পরামর্শদাতা অ্যাম্বাসেডর উইলিয়াম বি. মাইলামের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। বিল গতকাল [মঙ্গলবার] শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি তার প্রিয় বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার দেখে যাওয়ার মতো দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন।"

"আমি বিলের অধীনে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—উভয় দেশেই কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি এবং অবসরের পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক মানবাধিকার গোষ্ঠীতেও কাজ করেছি। কিন্তু তিনি বসের চেয়েও অনেক বেশি কিছু ছিলেন—তিনি ছিলেন একজন বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং পিতার মতো। আমার জীবনের অন্যতম বড় আনন্দের স্মৃতি হলো এক বছর আগে বিলের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ সফরে তাঁর সঙ্গী হওয়া। যারা সেই সফর সফল করতে সাহায্য করেছিলেন, তাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই।"

ড্যানিলোভিচ বলেন, "আগামী দিনগুলোতে আমি বিলের জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে আরও কথা বলব। 'রাইট টু ফ্রিডম'-এ আমরা তাঁর শুরু করা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অব্যাহত রাখব। বিদায় এবং শান্তিতে ঘুমান অ্যাম্বাসেডর।" ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকায় এক সংলাপে মাইলাম বলেছিলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ শাসনামলে গত ১০ বছরে তাকে বাংলাদেশে আসার ভিসা দেওয়া হয়নি।

গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলা মাইলাম বলেছিলেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হিসেবে তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন এবং তাঁর সেই লেখাগুলোই তাঁকে ক্ষমতাসীনদের শত্রুতে পরিণত করেছিল।