অতিরিক্ত লবণেই বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ২৪ হাজার মানুষ, লবণ, মানুষের মৃত্যু, মৃত্যু, বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ, ঢাবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন,
বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ অনুষ্ঠানের দৃশ্য।   ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় ৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে।

বুধবার (১৩ মে) বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বক্তারা। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্যে সংস্থাটির সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন বিশ্বব্যাপী বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়ানোর পাশাপাশি হৃদরোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে লবণের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. আহমাদ খাইরুল আববার জানান, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে এবং এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ অকালে মারা যান। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও পাকস্থলির ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণকে এ সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত বলেন, খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশে ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) চালু করা গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে। খাদ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি তথ্য উল্লেখ থাকলে ভোক্তারা স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে পারবেন এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের পুষ্টিগুণ উন্নত করতে উৎসাহিত হবে।

এদিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা “লুকায়িত লবণ” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, চিপস, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, আচার, স্যুপ, বিস্কুটসহ নানা জনপ্রিয় খাবারে অতিরিক্ত লবণ থাকে। এমনকি অনেক মিষ্টি স্বাদের খাবারেও উচ্চমাত্রার সোডিয়াম রয়েছে, যা অধিকাংশ মানুষ জানেন না। ফলে অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ খেয়ে ফেলছেন ভোক্তারা।

তিনি উচ্চ লবণযুক্ত খাবার চিহ্নিত করতে বাধ্যতামূলক ওয়ার্নিং লেবেল চালু, প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপাদান পুনর্গঠন এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. সাইদুল আরেফিন বলেন, দেশে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে এসব খাবার গ্রহণের প্রবণতা ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ফারুক আহম্মেদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এখন নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্যের মোড়কে স্পষ্ট পুষ্টি তথ্য উল্লেখ করা এবং কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সরকার, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।