বিলাসবহুল গাড়ি
বিলাসবহুল গাড়ি   ছবি : সংগৃহীত

কোটি টাকা দামের গাড়ি আছে, কিন্তু আয়কর নথিতে সেই গাড়ির তথ্য নেই -এমন মালিকদের এবার খুঁজে বের করতে মাঠে নামছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। উচ্চমূল্যের ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের আয়কর রিটার্ন, সম্পদের বিবরণ এবং গাড়ি কেনার অর্থের উৎস যাচাইয়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে থাকা গাড়ির মালিকানা ও নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি মিলিয়ে দেখবেন মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তারা। উদ্দেশ্য -কারা নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছেন, কারা গাড়ির তথ্য রিটার্নে দেখাননি এবং কারও ঘোষিত আয়-সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা চিহ্নিত করা।

৫ হাজার ৪৮৯ বিলাসবহুল গাড়ি

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ হাজার ৪৮৯টি উচ্চমূল্যের বা বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭১৯টির তথ্য মালিকদের আয়কর নথিতে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ১ হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য আয়কর নথিতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও বিআরটিএর বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এখন সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলগুলো এসব গাড়ির মালিকদের তথ্য যাচাই করবে। বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে আয়কর নথি মিলিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে গাড়ির মালিক নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছেন কি না এবং রিটার্নে গাড়িটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।

গাড়ির দাম বনাম ঘোষিত সম্পদ

একজন ব্যক্তির নামে কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি রয়েছে, অথচ আয়কর নথিতে সেই সম্পদের কোনো তথ্য নেই—এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে কর কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়। তবে শুধু দামি গাড়ির মালিক হওয়াই কর ফাঁকির প্রমাণ নয়।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল বিষয় হবে গাড়ির মূল্য ও মালিকের ঘোষিত আয়-সম্পদের মধ্যে কোনো বড় ধরনের অসামঞ্জস্য আছে কি না। থাকলে গাড়িটি কেনার অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয় এবং সম্পদের বিবরণ আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হতে পারে।

অর্থাৎ, গাড়ির মালিকানা থেকে পাওয়া তথ্যকে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে আয়কর নথির সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকে এনবিআরের নির্দেশ

সম্প্রতি কর কমিশনারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের তথ্য যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্ত দল নিজ নিজ এলাকার উচ্চমূল্যের গাড়ির মালিকদের তথ্য পর্যালোচনা করবে। যারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না, তাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি রিটার্নে গাড়ির তথ্য রয়েছে কি না, সেটিও দেখা হবে।

একই বৈঠকে কর ফাঁকি শনাক্তে অনুসন্ধান ও তদন্ত দলকে আরও সক্রিয় করা, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্রধারীদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

যেসব গাড়িতে নজর

দেশে চলাচল করা উচ্চমূল্যের গাড়ির তালিকায় রয়েছে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, অডি, ল্যান্ড রোভার, রেঞ্জ রোভার, পোর্শে, জাগুয়ার, লেক্সাস, ক্যাডিলাক, মাসেরাতি ও রোলস রয়েস। সীমিত সংখ্যায় ফেরারি, ল্যাম্বরগিনি ও টেসলার মতো গাড়িও রয়েছে।

এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এসব গাড়ির অনেকগুলোর বাজারমূল্য এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা বা তারও বেশি। ইঞ্জিনের ক্ষমতা ও সিসির ওপর নির্ভর করে এসব গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-করও তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে এনবিআরের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলছেন, গাড়ির উচ্চমূল্য নিজেই কর ফাঁকির প্রমাণ নয়। বরং ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে সেটি যাচাইয়ের ভিত্তি হতে পারে।

আগের অনুসন্ধানেও মিলেছিল ৪০৯ মালিক

বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের কর নথি যাচাইয়ের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগে গত বছর সিআইসির অনুসন্ধানে ৪০৯ জন গাড়ির মালিকের তথ্য পাওয়া যায়। তারা বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কিনে ব্যবহার করছিলেন এবং বিআরটিএতে গাড়ির নিবন্ধনও ছিল। কিন্তু তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এই অনুসন্ধানের পর বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা ও আয়কর নথির তথ্য সমন্বয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

বর্তমান যাচাইয়ে ১ হাজার ৩৩৯টির বেশি গাড়ির তথ্য আয়কর নথিতে অপ্রদর্শিত অবস্থায় পাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলগুলো এখন যাচাই করবে—এসব গাড়ির মালিকদের মধ্যে কারা নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছেন, কারা রিটার্ন দিচ্ছেন না এবং কারও আয়-সম্পদের সঙ্গে গাড়ির মূল্যের উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না।

সরকারি তথ্যই হবে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

এনবিআর মনে করছে, বিআরটিএর তথ্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস হতে পারে। কারণ গাড়ির নিবন্ধন থেকে মালিকের পরিচয় ও মালিকানা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। সেই তথ্য আয়কর নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে রিটার্ন দাখিল না করা কিংবা সম্পদের তথ্য অপ্রদর্শিত রাখার সম্ভাব্য ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হবে।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা গেলে করযোগ্য ব্যক্তি শনাক্তের সুযোগ বাড়বে। গাড়ির মালিকানা, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন মিলিয়ে দেখলে আয়-সম্পদের অসামঞ্জস্যও চিহ্নিত করা সম্ভব।

এনবিআরের সাবেক সদস্য (কর নীতি) সৈয়দ আমিনুল করিমের মতে, বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বিতভাবে যাচাই করা হলে রিটার্ন দাখিল না করা করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি আয়-সম্পদের অসামঞ্জস্য ও সম্ভাব্য কর ফাঁকির ঘটনাও চিহ্নিত করা সম্ভব।

শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে বিএমডব্লিউ জব্দ

বিলাসবহুল গাড়িকে ঘিরে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার সাত্তার মঞ্জিল থেকে গাড়িটি জব্দ করা হয়। সিআইআইডির অভিযোগ, উচ্চহারের শুল্ক এড়াতে গাড়িটিকে তিন থেকে চারটি বড় অংশে কেটে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেশে আনা হয়েছিল। পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরি করা হয়।

সিআইআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রো-ঘ-১১-৩৬৫১ নম্বরের গাড়িটি শনাক্ত করা হয়। গাড়িটির ক্রয় ও আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে বর্তমান মালিক দেশের বাইরে থাকায় তাঁর স্ত্রী প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি বলে জানায় সংস্থাটি।

এ ছাড়া গাড়িটির চাবি চাওয়া হলেও তা দেওয়া হয়নি বলে সিআইআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়া এবং চাবি না দেওয়ার পর গাড়িটি জব্দ করা হয়।

গাড়িটি মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয়েছিল কি না, কীভাবে দেশে আনা হয়েছে এবং এতে কত টাকার শুল্ক ফাঁকি হয়েছে- এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ।

সামনে আরও বড় পরিসরে যাচাই

শুধু বিলাসবহুল গাড়ির মালিক নয়, করজাল সম্প্রসারণে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও নজরদারি বাড়াচ্ছে এনবিআর। উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং সঞ্চয়পত্রধারীদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর অঞ্চলের অনুসন্ধান ও তদন্ত দলকে সক্রিয় করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিআরটিএর গাড়ির তথ্য আর এনবিআরের আয়কর নথির মধ্যে সমন্বয় এখন কর নজরদারির নতুন একটি হাতিয়ার হতে যাচ্ছে। কোটি টাকার গাড়ি কার নামে, সেই গাড়ি কেনার অর্থের উৎস কী এবং সেই সম্পদের তথ্য কর নথিতে যথাযথভাবে আছে কি না -এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হচ্ছে এই যাচাই।

তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, আয়-সম্পদের তথ্য এবং কর কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের ফলাফলের ওপর।

তথ্য সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন