কঠোর এনবিআর: রিটার্ন না দিলে জরিমানা, সেবা বন্ধের হুঁশিয়ারি
রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।   ছবি: এআই

দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ হলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন মাত্র সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা। ফলে প্রায় ৭৮ লাখ টিআইএনধারী কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছেন। এই পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ রিটার্ন দাখিলের বর্ধিত সময়সীমা শেষ হয়েছে। আয়কর আইন অনুযায়ী বছরে ন্যূনতম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা (সাধারণ করদাতার ক্ষেত্রে) আয় হলে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে এই সীমা বেশি। এর বাইরে টিআইএনধারী হলে নির্দিষ্ট কিছু সেবা পেতে গেলেও রিটার্ন জমার প্রমাণ লাগতে পারে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, রিটার্ন না দেওয়া করদাতাদের চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো হবে। এরপরও রিটার্ন জমা না দিলে কর পরিদর্শক সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসায় গিয়ে আয়–ব্যয়ের তথ্য যাচাই করবেন। প্রয়োজন হলে জরিমানা আরোপ, অতিরিক্ত কর ধার্য এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ই-টিআইএন ও ই-রিটার্ন ডাটাবেজ থেকে ‘নন-ফাইলার’ তালিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে। সেই তালিকার ভিত্তিতে নোটিশ দেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হবে।

তিনি আরও বলেন, কর নিরীক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে ম্যানুয়াল বাছাই পদ্ধতি বন্ধ করে ‘রিস্ক বেসড অটোমেটেড অডিট সিলেকশন’ চালু করা হয়েছে। এতে কোনো মানবিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই ঝুঁকিভিত্তিকভাবে করদাতা নির্বাচন করা হচ্ছে।

কর ফাঁকি কমাতে উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে সংস্থাটি। বিভিন্ন পণ্যে কিউআর কোড সংযুক্ত করে ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।

রিটার্ন না দিলে যেসব ঝুঁকি

জরিমানা: আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত করের ওপর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ হারে জরিমানা, সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা। সময় পার হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানাও যোগ হতে পারে।

অতিরিক্ত কর (সারচার্জধর্মী চাপ): নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়।

কর রেয়াত হারানো: সঞ্চয়পত্র, জীবনবীমা, পেনশন স্কিমসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে যে কর ছাড় পাওয়া যায়, তা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

সেবা-সংযোগে বাধা: বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা-সংযোগ পাওয়া বা নবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতাও রয়েছে কর কর্তৃপক্ষের।

ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনে সমস্যা: ঋণ নেওয়া, ক্রেডিট কার্ড সুবিধা পাওয়া, বড় অঙ্কের লেনদেন বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে।

সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়ে জটিলতা: জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি নিবন্ধন বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বাধ্যতামূলক হতে পারে।

চাকরিতে বেতন-ভাতা জটিলতা: সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট সীমার বেশি বেতন হলে রিটার্ন জমার কপি দিতে হয়। না দিলে বেতন-ভাতা আটকে রাখা বা বিলম্বের ঝুঁকি থাকে।

আইনি জটিলতা: দীর্ঘদিন রিটার্ন না দিলে তদন্ত, নিরীক্ষা এবং আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারেন।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআর ভ্যাট ও আয়কর—দুই ক্ষেত্রেই তৎপরতা বাড়িয়েছে। করনেট সম্প্রসারণ, বকেয়া আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাত চিহ্নিত করতে ইতিমধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে রাজস্ব আদায়ে গতি আনতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।