শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি ব্যাংকে নিয়োগ ও ছাঁটাই নিয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক
শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি ব্যাংকে নিয়োগ ও ছাঁটাই নিয়ে তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।   ছবি: আরটিএনএন

দেশের শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি ব্যাংকে নিয়োগ ও ছাঁটাই প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন নতুন করে সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিষয়টি বিধিসম্মতভাবে হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তদন্তে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরে এসব ব্যাংকের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে দুটি বিপরীত অবস্থান তৈরি হয়। এক পক্ষ বলছে ছাঁটাই প্রক্রিয়া নিয়ম অনুযায়ী হয়নি, অন্য পক্ষ দাবি করছে সব কিছুই নীতিমালা মেনে সম্পন্ন হয়েছে।

এই অবস্থায় পুরো বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি নিয়োগ ও ছাঁটাই প্রক্রিয়ার বৈধতা যাচাই করবে, তবে কোনো সুপারিশ দেবে না।

তদন্তে বিশেষভাবে দেখা হচ্ছে- নিয়োগের আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল কি-না, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে কি-না এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়াও নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী চাকরিচ্যুত হন।

ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের একাংশের দাবি, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। তারা গত ১৯ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশ করে পুনর্বহালের দাবি জানান। একই দিন ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের নামে পাল্টা কর্মসূচি পালন করে আরেকটি পক্ষ। তাদের দাবি, ছাঁটাই প্রক্রিয়া নিয়ম মেনে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, তদন্ত কমিটি কেবল তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে প্রতিবেদন দেবে, কোনো সুপারিশ করবে না। প্রতিবেদন গভর্নরের কাছে জমা হওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় প্রয়োজনে প্রতিবেদন আদালতেও উপস্থাপন করা হতে পারে।

এদিকে, ইসলামী ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অতীত ব্যবস্থাপনাও আলোচনায় এসেছে। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে আসার পর ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে প্রায় ১১ হাজার জনবল নিয়োগ হয়।

ব্যাংকটির বর্তমান কর্তৃপক্ষের দাবি, এর মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ হয় আট হাজার ৩৪০ জনের। তাদের মধ্য পাঁচ হাজার ৩৮৫ জনের যোগ্যতা মূল্যায়নে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার আয়োজন করে ইসলামী ব্যাংক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নেয় মাত্র ৪১৪ জন। বাকি চার হাজার ৯৫৩ জন অংশ না নেওয়ায় প্রথমে তাদের ওএসডি এবং পরবর্তী সময়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষার উদ্যোগ বাতিল চেয়ে গত ২১ আগস্ট হাইকোর্টে একটি রিট করেন ব্যাংকটির চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. জিয়া উদ্দিন নোমান। বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন আদালত। এরপর গত ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিটকারীকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়নের পরীক্ষা নেওয়া এবং চাকরিতে কাউকে রাখা বা না রাখার বিষয়টি ব্যাংকের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত।

এই পরিস্থিতি ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর জন্য একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে রয়েছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও আইনি গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, অন্যদিকে কর্মী ও গ্রাহক পর্যায়ে আস্থার সংকট। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও বিচারাধীন বিষয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এসব ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।