দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অন্তত ২৮টি ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অন্তত ২৮টি ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়েছে।   ছবি: আরটিএনএন

দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অন্তত ২৮টি ব্যাংক আর্থিক চাপে পড়েছে। ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নেওয়া বিপুল ঋণ খেলাপি হয়ে পড়া এবং সেই অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ও বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচিত ছয় গোষ্ঠী হলো-এস আলম, আরামিট, সিকদার, বেক্সিমকো, ওরিয়ন ও নাসা গ্রুপ। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, নামে-বেনামে ঋণ গ্রহণ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্য জানা যায়নি।

আরামিট গ্রুপ
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপের কারণে ৯টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যাংক থেকে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ এখন খেলাপি। সংশ্লিষ্ট সম্পদ উদ্ধারে ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনডিএ সই করা হয়েছে।

এস আলম গ্রুপ
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে ১৩টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে সংস্থাটি ধারণা করছে। অর্থ উদ্ধারে ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে তিনটি এনডিএ সই হয়েছে।

বেক্সিমকো গ্রুপ
সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের কারণে ১৪টি ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের একক ঋণ ২৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা এখন খেলাপি। গ্রুপটির বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্তে ৯টি চুক্তি করা হয়েছে।

সিকদার গ্রুপ
সিকদার গ্রুপের কারণে ১১টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক তুলনামূলক বেশি চাপে রয়েছে, যা দীর্ঘদিন এ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আইএফআইসি, অগ্রণী ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নাসা গ্রুপ
নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের কারণে ১১টি ব্যাংক সংকটে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। আগে এসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও বর্তমানে অধিকাংশই খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। সম্পদ উদ্ধারে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ও আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক কাজ করছে এবং কয়েকটি এনডিএ সই হয়েছে।

ওরিয়ন গ্রুপ
ওরিয়ন গ্রুপের কারণে ১২টি ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাচার হওয়া সম্পদের খোঁজে অগ্রণী ব্যাংক ও ইউসিবি একটি এনডিএ সই করেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত এ টাস্কফোর্স বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করছে।

পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে একটি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা ইউনিট এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যুক্ত রয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে টাস্কফোর্সের বৈঠকে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে ছয়টি গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার তালিকায় আনা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব গোষ্ঠীর কাছেই মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ রয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং দেশে-বিদেশে সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত।