ইসলামী ব্যাংকে অভিযুক্ত লুটেরাদের না ফেরাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে ব্যাংকটির গ্রাহকরা।
ইসলামী ব্যাংকে অভিযুক্ত লুটেরাদের না ফেরাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে ব্যাংকটির গ্রাহকরা।   ছবি: আরটিএনএন

রাজধানীর মতিঝিলের ইসলামী ব্যাংকের লোকাল শাখায় মঙ্গলবার সকালে স্বাভাবিকের তুলনায় গ্রাহকের উপস্থিতি কিছুটা বেশি দেখা যায়। হঠাৎ এই ভিড়কে কেন্দ্র করে শাখা প্রাঙ্গণে এক ধরনের উদ্বেগ ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানান উপস্থিত কয়েকজন গ্রাহক। শাখার সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্তরোর্ধ্ব গিয়াস উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় নিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছি।

তিনি বলেন, খবর শুনে ভয় লাগছে। ব্যাংক নাকি এস আলমের হাতে যাবে, টাকা নিরাপদ থাকবে কি না- এটা নিশ্চিত না। তাই কিছু টাকা তুলে নিচ্ছি।

একই শাখায় টাকা তুলতে আসা গৃহিণী আছিয়া বেগমও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য রাখা মেয়াদি আমানত নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানান। তার ভাষায়, টিভিতে নানা কথা শুনছি। আমরা সাধারণ মানুষ, রাজনীতি বুঝি না- আমরা শুধু টাকার নিরাপত্তা চাই। অনেক কষ্টে জমানো টাকা, তাই ঝুঁকি নিতে চাই না।

পল্টন শাখার সামনে কথা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি জানান, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে গেলে দৈনন্দিন লেনদেনেও এর প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, ব্যবসার ক্যাশ ফ্লো ঠিক রাখতে হয়। কিন্তু নানা আলোচনা ও গুঞ্জনে সাপ্লায়ারদের পেমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। তাই আপাতত কিছু অর্থ অন্যত্র সরিয়ে রাখছি।

ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের পুনরায় প্রভাব বাড়তে পারে- এমন খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।

“টিভিতে নানা কথা শুনছি। আমরা সাধারণ মানুষ, রাজনীতি বুঝি না- আমরা শুধু টাকার নিরাপত্তা চাই। অনেক কষ্টে জমানো টাকা, তাই ঝুঁকি নিতে চাই না” - আছিয়া বেগম।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।

গত রোববার রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এস আলম সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। অভিযোগ আছে, মব করে ব্যাংকটি দখলের পরিকল্পনাও করেছিলেন তারা।

এ ঘটনার পর আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন হয়ে অনেকেই টাকা তুলে ফেলছেন। শুধু আমানতকারীরা নয় যেসব প্রবাসী ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠান নতুন আইন তাদেরও বিচলিত করছে। 

আবুল হাশেম নামের একজন প্রবাসী বলেন, এস আলম ইসলামী ব্যাংক দখল নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। আবার  মালিকানা পেলে পুরো ব্যাংকই লুট করে নেবে। এই ব্যাংকের মাধ্যমে আর রেমিট্যান্স পাঠাবো কিনা তা ভেবে দেখবো।

জানা গেছে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি বড় অংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ পথে প্রবাসী আয় কিছুটা বাড়লেও চলমান অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

“এস আলম ইসলামী ব্যাংক দখল নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। আবার  মালিকানা পেলে পুরো ব্যাংকই লুট করে নেবে। এই ব্যাংকের মাধ্যমে আর রেমিট্যান্স পাঠাবো কিনা তা ভেবে দেখবো”- আবুল হাশেম, সৌদি প্রবাসী।

এদিকে রোববার ইসলামী ব্যাংকসহ ছয় ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মীদের মানববন্ধনের পর একই স্থানে পাল্টা কর্মসূচি পালন করে ইসলামী ব্যাংকের ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ। সংগঠনের নেতারা এস আলমকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাচারকৃত অর্থ ফেরত এবং ব্যাংক রেজুল্যুশনের নতুন ধারা বাতিলসহ পাঁচ দফা দাবি জানান।

মানববন্ধনে তারা ‘ইসলামী ব্যাংক দখলের পায়তারা বন্ধ’, ‘ব্যাংক দখলের কালো আইন বাতিল’, ‘এস আলম নো মোর’—ব্যানার প্রদর্শন করেন।

ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় পরিষদের সভাপতি নুরুন নবি মানিক বলেন, আমাদের পাঁচটি দাবি রয়েছে। ব্যাংক লুটেরা এস আলম ও সকল শীর্ষ লুটেরাকে গ্রেপ্তার এবং দেশীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একই সাথে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে হবে। 

ব্যাংক লুটেরাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাংক রেজুল্যুশন আইনে সংযোজিত ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। ব্যাংকের সামনে অবৈধভাবে মব সৃষ্টিকারী এস আলমের দোসর, পটিয়া বাহিনীকে পুনরায় সুযোগ দেওয়া হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায় নিতে হবে। মব সৃষ্টিকারী কোনো অবৈধ দখলদার বাহিনীকে ব্যাংকে প্রবেশের সুযোগ দিলে তা বরদাশত করা হবে না। ব্যাংকের প্রকৃত মালিক যাদের কাছ থেকে হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর মাধ্যমে জোরপূর্বক এস আলম মালিকানা দখল করেছিল, তাদের হাতে অতি দ্রুত ব্যাংক মালিকানা ফেরত দিতে হবে।

একজন অর্থনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা কমে গেলে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হতে পারেন, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

সম্প্রতি প্রণীত ব্যাংক খাতসংক্রান্ত নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, রেজুল্যুশন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত অন্য কোনো পক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ার ও দায়-সম্পদ গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালনা, মূলধন ঘাটতি পূরণ, ঋণ ও আর্থিক দায় নিষ্পত্তি, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং কর পরিশোধসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করতে হবে।

এছাড়া ক্ষতিপূরণ প্রদান, শেয়ার হস্তান্তরে নির্দিষ্ট সময়ের বিধিনিষেধ মানা এবং সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের শর্তও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অনুমোদনের পর তিন মাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে হলে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থের ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম জমা দিতে হবে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।

নতুন আইন হওয়ার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ‘লুটেরাদের পুনর্বাসন’ অভিধায় সমালোচনাও চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবারও নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

“১৮(ক) ধারা কার্যত পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার মতো। এতে ব্যাংক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং জবাবদিহির জায়গা দুর্বল হয়ে পড়বে”- এম হেলাল আহমেদ, অর্থনীতিবিদ।

এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

ইসলামী ব্যাংকের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ব্যাংকটির পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এ ধরনের বিধান নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তার মতে, অতীতের বিতর্কিত মালিকরা আবার নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংক পরিচালনা ও আমানত সুরক্ষা—দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ বলেন, ১৮(ক) ধারা কার্যত পুরোনো সমস্যার ওপর নতুন কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার মতো। তার মতে, এতে ব্যাংক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং জবাবদিহির জায়গা দুর্বল হয়ে পড়বে।