ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ
ইইউ-যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে শীর্ষে বাংলাদেশ   ছবি: সংগৃহীত

জিনস বা ডেনিম পোশাক রপ্তানির বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শুধু শক্তিশালীই নয়, বরং নেতৃত্বস্থানীয়। প্রায় চার দশক আগে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বের দুই বৃহত্তম বাজারেই শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরে এই দুই বাজারে বাংলাদেশ মোট প্রায় ২৬০ কোটি মার্কিন ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ, যা খাতটির ধারাবাহিক সম্প্রসারণের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পৌঁছেছে ৯৬ কোটি ডলারে, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৩৪ শতাংশ। এই বাজারে প্রায় ২৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হয়েছে ১৬৪ কোটি ডলারের ডেনিম পণ্য, যেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। এই বাজারেও বাংলাদেশ তার শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা অবশ্য কম নয়। বাংলাদেশের পরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো, যারা ৬৪ কোটি ডলারের ডেনিম রপ্তানি করেছে। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানও প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পরেই অবস্থান করছে পাকিস্তান, যার রপ্তানি পরিমাণ ১০৩ কোটি ডলার। পাশাপাশি তুরস্ক, তিউনিসিয়া এবং চীনও এই খাতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং শিল্পের কাঠামোগত উন্নয়ন। গত দেড় দশকে ডেনিম শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে দেশে ডেনিম কাপড় উৎপাদনকারী মিলের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১২টি, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫০টির কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড় এখন মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আগে আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়াও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। গ্যাস ও পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীন থেকে অনেক ক্রয়াদেশ সরে এসে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এছাড়া ঢাকায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক ডেনিম প্রদর্শনীর আয়োজন দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ছে এবং দেশের ডেনিম শিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও পরিচিতি পাচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানান, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ওয়াশিং প্ল্যান্ট এবং উন্নত উৎপাদন সুবিধা স্থাপনের ফলে পণ্যের গুণগত মানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রতিযোগিতামূলক খরচ এবং বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের ডেনিম শিল্প এখন একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক বাজারে দেশের নেতৃত্ব আরও সুসংহত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

 

এসএস