৫৫ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে অ্যালায়েন্স ক্যাপিটাল।
৫৫ কোটি টাকা আত্মসাত করেছে অ্যালায়েন্স ক্যাপিটাল।   ছবি: সংগৃহীত

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুটি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ইউনিটহোল্ডারদের ৫৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ঘটনায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সম্প্রতি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি জানায়, বিএসইসির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এমটিবি ইউনিট ফান্ড ও অ্যালায়েন্স সন্ধানী লাইফ ইউনিট ফান্ড থেকে ৪৫ কোটি টাকা সরাসরি সরিয়ে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে সুদজনিত ক্ষতি যোগ হয়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। আরও গুরুতর বিষয় হলো, প্রকৃত সম্পদের পরিবর্তে নগদ বা অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখিয়ে ফান্ডগুলোর নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে।

বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এই অর্থ ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অর্থ ব্যবস্থাপনায় ইচ্ছাকৃত অনিয়ম হয়েছে এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা পক্ষগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল।

বিএসইসি চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ২০১৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী খন্দকার আসাদুল ইসলামের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বন্ধ করা প্রয়োজন। এর আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।

দুই ফান্ডের ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি পিএলসি (বিজিআইসি)। তদন্তে ট্রাস্টি, নিরীক্ষক ও কাস্টডিয়ানের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির বিষয়ও উঠে এসেছে। কমিশন ট্রাস্টিকে দুই মাসের মধ্যে প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে ফান্ডগুলোর পুনর্মূল্যায়ন সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। এরপর এক মাসের মধ্যে ইউনিটহোল্ডারদের সঙ্গে সভা করে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।

পুনর্মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।

অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানায় বিএসইসি। বিনিয়োগকারীদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়নি।

কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেশত্যাগ করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ পুলিশ ও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ইউনিটহোল্ডারদের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ স্পষ্ট। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে এমন ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; এটি তদারকি কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে আনে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত, দৃশ্যমান এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।