ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন এক সময়ে দেশের অর্থনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নতুন সরকার এমন এক অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে যাচ্ছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ, বিনিয়োগে আস্থার সংকট এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা স্পষ্ট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলেছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি শিল্পোৎপাদন ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে সীমিত করছে। দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নীতিগত অস্পষ্টতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে সংশয় বিরাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে—ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বাজারে আস্থা পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। এখানে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির হঠাৎ পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক সংকেত তৈরি করতে পারে।
চলমান সংস্কার ও ধারাবাহিকতার প্রশ্ন
ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে যে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিক পরিণতি নিশ্চিত করা নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব। সংস্কারের অর্ধসমাপ্ত অবস্থা অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। ফলে শুধু নতুন কর্মসূচি ঘোষণা নয়, পূর্ববর্তী উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণ জরুরি।
বিশেষত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি ও শাসন সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এগুলো সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পেশাদার নেতৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো এলডিসি থেকে উত্তরণ। এতদিন যেসব বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার সুবিধা পাওয়া গেছে, উত্তরণের পর সেগুলো ক্রমান্বয়ে সীমিত হবে। ফলে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তিতে টিকে থাকতে হবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও অনুকূল নয়—বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে নতুন বাণিজ্য জোট ও সুরক্ষাবাদী প্রবণতা বাজারে প্রবেশকে কঠিন করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠন হবে কৌশলগত অগ্রাধিকার।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বনাম রাজস্ব বাস্তবতা
নির্বাচনী ইশতেহারে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি, সর্বজনীন কর্মসূচি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও তুলনামূলকভাবে নিম্ন।
অতএব, রাজস্ব বাড়াতে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। করভিত্তি সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি হ্রাস—এসব পদক্ষেপ নিলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে এবং অপ্রত্যক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। অন্যথায় ঋণনির্ভর ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ বাড়াবে ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করবে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হবে তাদের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। বাস্তবসম্মত রাজস্ব প্রক্ষেপণ, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে মূল চ্যালেঞ্জ। অযথা উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়ানোর পরিবর্তে চলমান প্রকল্প দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে সম্পন্ন করা অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।
একই সঙ্গে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। বিনিয়োগ চাঙা করতে সুদের হার, ঋণপ্রবাহ ও কর প্রণোদনার মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও জবাবদিহি
অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং পারফরম্যান্স-নির্ভর মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে সুশাসনের ভিত মজবুত হবে।
সংসদীয় কমিটির কার্যকর ভূমিকা, বিরোধীদলের অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের স্বাধীন সমালোচনা—এসব মিলেই জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতির ধারাবাহিকতা কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রতিফলন।
নতুন সরকারের সামনে যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে জটিল ও বহুমাত্রিক। তবে সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই চ্যালেঞ্জগুলোই সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি আস্থা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার সমন্বিত ফল।
রাষ্ট্র যদি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির এই ভিত্তি সুদৃঢ় করতে পারে, তবে বর্তমান সংকটই ভবিষ্যৎ রূপান্তরের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!