জবিতে জকসু-শিবিরের ওপর ছাত্রদলের হামলা, নেপথ্যে টেন্ডার!
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এলাকায় সংঘর্ষের এক পর্যায়ে একজনকে মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়।   ছবি: প্রথম আলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। এতে আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ জন। পরবর্তীতে আহতরা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও হামলা করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জকসু নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সামনেই ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা করে। এসময় প্রশাসন নিশ্চুপ ছিল। মূলত তাদের ইন্ধনেই হামলা করে ছাত্রদল। 

মঙ্গলবার জুলাই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর এক অনুষ্ঠান উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন হোসেন। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিতে সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করছিল জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা। আর এই কর্মসূচিতেই হামলা করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

কিন্তু ক্যাম্পাসের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচিতে ছাত্রদল কেন হামলা করলো? এই ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে ২০ কোটি টাকার একটি অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের বরাদ্দ আসে। কেরাণীগঞ্জে ৭ একর জমির ওপর এই অস্থায়ী আবাসন বানানোর পরিকল্পনা নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অস্থায়ী আবাসনটি কর্মচারীদের জন্য তৈরি করা হবে। যদিও এখানে শিক্ষার্থীরাও থাকতে পারবেন। কিন্তু টেন্ডারের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে বলেও জানানো হয়। 

তবে জকসু নেতাদের অভিযোগ, অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের কাজটি সেনাবাহিনীকে দিয়ে দ্রুত নির্মাণ করার দাবি ছিল সবার। কিন্তু প্রশাসন চায়, টেন্ডার আহবানের মাধ্যমে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা। কিন্তু এটি একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া। তাছাড়া, টেন্ডারের ফলে প্রশাসন ও ছাত্রদল যৌথভাবে বড় অঙ্কের চাঁদাবাজি করবে। এরফলে তারা সেই শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সহমত ছিল না। 

এর প্রেক্ষিতেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন হোসেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে তার সামনে দাবি পেশ করা হয়। এসব দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় ধাপের কাজ দ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, সরকার বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকা দিয়ে চলতি বছরের মধ্যেই ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ল্যাব টেকনিশিয়ান ও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া।

এসব দাবিতে কর্মসূচি পালন করতে আসলে জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল। এতে জকসুর জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া, সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ, জকসুর একাধিক সদস্যসহ প্রায় ১৫ জন আহত হন। সংঘর্ষের পর ছাত্রশিবির ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় আহতদেরকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিকেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানেও হামলা চালায়। শিক্ষার্থীদের উদ্ধার ও দেখতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন এবং অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক হাসপাতালের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তারা আহত শিক্ষার্থীদের রেখে হাসপাতাল ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান।

এ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আজম খানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, রসায়ন বিভাগ এবং মোঃ মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।

তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়।

অভিযোগের ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, তারা কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন দাবির বিরুদ্ধে নয়। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিবির যেভাবে ‘মব কালচার’ চালু করেছে এবং নিষিদ্ধ কার্যক্রম ঢাকার চেষ্টা চালাচ্ছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেই ‘মব রুখে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে প্রোগ্রাম চলাকালীন সময়ে বাইরে বিশৃঙ্খলা সংঘটিত হয়। প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখা হলেও যেকোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরিতে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।