নগর উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছপালা কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং কংক্রিটনির্ভর স্থাপনা নির্মাণের কারণে রাজধানীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।
নগর উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছপালা কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং কংক্রিটনির্ভর স্থাপনা নির্মাণের কারণে রাজধানীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।   ছবি: আরটিএনএন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আর্থ ক্লাবের উদ্যোগে “কংক্রিটের বাইরে: ঢাকা শহরের পাখি, জলবায়ু ও নগর প্রতিবেশ” শীর্ষক একটি তথ্যবহুল সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

রবিবার (১৭ মে) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ১২৩৮ নম্বর কক্ষে এ আয়োজন সম্পন্ন হয়।

ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকার নগর প্রতিবেশ এবং পাখিদের আবাসস্থল সংকট নিয়ে সেমিনারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। 

বক্তারা বলেন, নগর উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছপালা কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং কংক্রিটনির্ভর স্থাপনা নির্মাণের কারণে রাজধানীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং নগর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. লাসনা কবির।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেশের দুই বিশিষ্ট পরিবেশ ও প্রকৃতি গবেষক। বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘উইংস অব রেজিলিয়েন্স’-এর পরিচালক এবং নেচার সেভার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অস্কার ইবনে ফিরোজ। তিনি ঢাকার পাখিদের আচরণ, নগরায়নের কারণে তাদের আবাসস্থল হারানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নগর প্রতিবেশের ওপর পড়া বিরূপ প্রভাব নিয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টি গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে।

অন্য বক্তা বিশিষ্ট পরিবেশবিষয়ক লেখক ও ‘তরুপল্লব’-এর সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসাইন ঢাকার বৃক্ষরাজি, পাখির জীবনচক্র এবং নগর বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় গাছের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, নগর পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণ এবং বিদ্যমান সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

আলোচনায় বক্তারা নগর পরিকল্পনায় পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং পাখি ও সবুজ প্রকৃতি রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মিলিত সচেতনতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব।

আয়োজন নিয়ে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আর্থ ক্লাবের সভাপতি জুন্নুরাইন আল রুসান বলেন, “ঢাকার পাখি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে আবাসস্থল, জলজ ভূমি ও গাছ রক্ষা করতে হবে। আমাদের এই সচেতনতা কেবল সেমিনারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।”

সেমিনারের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত “কংক্রিটের বাইরে: ঢাকার পাখিদের কাছে খোলা চিঠি” শীর্ষক লিখন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ওয়ারদা আল জান্নাত ‘প্রেরণাদায়ী কলম পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়া দর্শন বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী ওয়ারদা জান্নাত তৃতীয় স্থান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সায়ীদা মাহবুবা ইসতিয়া দ্বিতীয় স্থান এবং আইরিন আক্তার প্রথম স্থান অর্জন করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। একই সঙ্গে আনন্দঘন পরিবেশে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আর্থ ক্লাবের নতুন সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।

সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এ সেমিনারে শিক্ষক, গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নগর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। 

এসএস