কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু, বাড়ছে খামারমুখী ক্রেতা
সরসিংদিতে গরুর খামার।   ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নরসিংদীর খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও কৃষকরা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেশীয় পদ্ধতিতে গরু, মহিষ ও ছাগল মোটাতাজাকরণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রাকৃতিক খাদ্যে লালন-পালন করা পশু বাজারজাতের প্রস্তুতিও চলছে জোরেশোরে।

এবার নরসিংদীর কয়েকটি খামারে নতুনভাবে চালু হয়েছে ওজনভিত্তিক বা লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরু বিক্রি। এতে গরুর ওজন অনুযায়ী কেজি দরে মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে, ফলে ক্রেতারা সরাসরি ওজন হিসাব করে পশু কিনতে পারছেন।

খামারিদের মতে, এ পদ্ধতিতে ক্রেতারা প্রতারণার ঝুঁকি কম পাচ্ছেন এবং তুলনামূলক স্বচ্ছ উপায়ে গরু কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণে দিন দিন এ ধরনের বিক্রয় পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

জেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটছে খামার মালিক ও কর্মচারীদের। নিয়মিত গোসল করানো, খাবার সরবরাহ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাসহ নানা কাজে ব্যস্ত তারা।

শুধু খামারিরাই নন, অনেক কৃষকও পারিবারিকভাবে লাভের আশায় কোরবানির পশু লালন-পালন করছেন। ঈদের কয়েক মাস আগে দেশের বিভিন্ন হাট থেকে গরু, মহিষ ও ছাগল কিনে এনে পালন শুরু করেন তারা। এবার জেলার খামারগুলোতে শাহীওয়াল, সিন্ধি, ফ্রিজিয়ান, ব্রাহমা ও দেশি-সংকর জাতের গরু প্রস্তুত করা হয়েছে।

খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করায় নরসিংদীর গরুর চাহিদা স্থানীয় এলাকার বাইরে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও রয়েছে। অনেক ক্রেতা হাটের ভিড় ও ভোগান্তি এড়িয়ে সরাসরি খামার থেকে গরু কিনছেন। এছাড়া ঈদের আগে বাড়িতে বিনামূল্যে গরু পৌঁছে দেওয়ার সুবিধাও দিচ্ছেন খামারিরা।

নরসিংদীর হাম্বা ফার্মসহ কয়েকটি খামারে এবার গরু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা দরে। খামারের পরিচর্যাকারী সোহেল জানান, গরুকে প্রতিদিন প্রাকৃতিক দানাদার খাদ্য খাওয়ানো হয় এবং নিয়মিত গোসল ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা রাখা হয়। ক্রেতারা গরু পছন্দ করার পর ঈদের আগেই তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

খামারিদের ভাষ্য, এবার বড় আকারের গরুর চাহিদা বেশি। জেলার বিভিন্ন খামারে ৩৫০ কেজি থেকে ১১০০ কেজি ওজনের গরু রয়েছে। তবে পশুখাদ্য, বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে তাদের মধ্যে।

হাম্বা ফার্মের ম্যানেজার ফারুক ইসলাম বলেন, এ বছর তাদের খামারে ২২০টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশ ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক খাদ্যে লালন-পালন করা এসব গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে গ্রীন এগ্রো ফার্মের চেয়ারম্যান আহসান শিকদার জানান, তাদের খামারে ২০০ কেজি থেকে ১২০০ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন জাতের গরু রয়েছে। ৪০০ কেজির নিচের গরু ৫৫০ টাকা এবং ৫০০ কেজির বেশি গরু ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। ক্রেতারা গরু দেখে পছন্দ করার পর নির্ধারিত সময়ে বাড়িতে ডেলিভারিও পাচ্ছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, খামারিদের নিরাপদ ও দেশীয় পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজাকরণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা স্টেরয়েড ব্যবহার ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ছাইফুল ইসলাম বলেন, খামারিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপদ পশু উৎপাদনে মোবাইল কোর্টসহ নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নরসিংদীর ছয় উপজেলায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৮৫ হাজার ৯০৫টি গবাদিপশু। জেলার চাহিদা ৭৮ হাজার ৬৪৫টি হওয়ায় অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার ২৬০টি পশু পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খামারিদের প্রত্যাশা, বাইরের পশুর অতিরিক্ত প্রবেশ না হলে এবং বাজার স্থিতিশীল থাকলে এবারের কোরবানির মৌসুমে তারা ন্যায্য দাম পেয়ে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।