সিলগালা অবস্থায় ফাইলেরিয়া হাসপাতালে গাছ নিধন, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ,
দেশের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতাল নীলফামারী।   ছবি: আরটিএনএন

নীলফামারীর সৈয়দপুরে অবস্থিত বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে এবং মামলার প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন ধরে সিলগালা অবস্থায় পড়ে আছে। প্রশাসনিক এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকা অবস্থায় হাসপাতালটির চত্বরে প্রায় ১০টি মেহগনি গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের নির্দেশে স্থানীয় তোতা মিয়া নামে এক ব্যক্তি গাছগুলো কেটেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের কোনো অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রশাসন খবর পেয়ে শনিবার (২ মে) দুপুরে স্থানীয় তহশিলদারকে পাঠিয়ে কাটা গাছগুলো জব্দ করেছে।

জানা যায়, গত শুক্রবার থেকে হাসপাতালের পাশের সুখীপাড়ার তোতা মিয়া গাছ কাটা শুরু করেন। ইতোমধ্যে দুই দিনে ১০টি বড় মেহগনি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। শনিবার সকালে আরও দুটি গাছ কাটার জন্য লোক নিয়োগ করা হয়। এগুলো কাটা হলে সব গাছের গুঁড়ি সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা ছিল।

এ অবস্থায় সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে তোতা মিয়া জানান, হাসপাতালের মালিক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকায় বসেই গাছ কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তোতা মিয়া বলেন, ‘এটি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান নয় যে গাছ কাটার জন্য বন বিভাগ বা প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে।’ সিলগালাকৃত প্রতিষ্ঠানে কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিলগালা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তালা ভেঙে চোরেরা ঢুকে ভবনের দরজা-জানালার অ্যাঙ্গেলসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া রাতের বেলা এটি নেশাখোরদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। হাসপাতালটি নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য গাছগুলো কাটা হয়েছে।’

নীলফামারী সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রাজ্জাক মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি বর্তমানে বাইরে আছি। তবে হাসপাতালটি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং দুই পক্ষের মামলার কারণে সিলগালা করা হয়েছে। সেখানে গাছ কাটা হচ্ছে—এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। যদি কাটা হয়ে থাকে, তাহলে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে চালু বা হস্তান্তরের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি।’

সৈয়দপুর উপজেলা সামাজিক বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইকুল ইসলাম মুস্তাকুর বলেন, ‘গাছ কাটার ক্ষেত্রে অবশ্যই বন বিভাগের অনুমতি নিতে হয়। ফাইলেরিয়া হাসপাতালের গাছ কাটার জন্য আমাদের কাছে কোনো আবেদন আসেনি, আমরা কোনো অনুমোদনও দিইনি।’

সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাব্বির হোসেন বলেন, ‘গাছ কাটার খবর পেয়ে কামারপুকুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) পাঠিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়েছে এবং কাটা গাছ জব্দ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তিগত হলেও সিলগালাকৃত থাকায় গাছ কাটার অনুমতি ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ফাইলেরিয়া হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যসচিব ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ব্যস্ততা দেখান। তিনি বলেন, ‘আমি মিটিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।’ তবে পরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডা. মোয়াজ্জেম এর আগেও হাসপাতালের যন্ত্রপাতি গোপনে সরিয়ে ঢাকার সাভারে আরেকটি হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। জাপান সরকারের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে স্থানীয়দের দানকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হলো তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বমানের এই হাসপাতালটি প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এখন পুনরায় চালুর নামে গাছ কেটে সাবাড় করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ। এলাকাবাসীর মতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য গাছের ডাল ছাঁটাই যথেষ্ট ছিল; পুরো গাছ কেটে ফেলার প্রয়োজন ছিল না। এ বিষয়ে তারা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন।