টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে দেশের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে দেশের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।   ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের চাপে দেশের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা।

সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বুধবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে জিনারিয়া হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। এতে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যায়। হাওরের অধিকাংশ জমিতে মৌসুমি কৃষকেরা চাষাবাদ করতেন। হঠাৎ এই বিপর্যয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

মুখশেদপুরের কৃষক বক্ত সরকার বলেন, “অনেক কষ্ট করে ধান ফলিয়েছি। এখন সব পানির নিচে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।”

উপজেলা কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, জিনারিয়া হাওরের ২৬ হেক্টরের মধ্যে আগে থেকেই ৮ হেক্টর জলাবদ্ধতায় তলিয়ে ছিল। বাঁধ ভাঙার পর আরও প্রায় ৩ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।

দোয়ারাবাজার উপজেলার নাইন্দার, কাংলার, দেখার হাওরসহ অধিকাংশ জলাভূমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

নেত্রকোনায় টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে জেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যদিও কৃষি বিভাগের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার হেক্টর।

জেলার পাঁচটি হাওর উপজেলা-মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা ও আটপাড়ায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। কৃষি বিভাগ বলছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, এখনো প্রায় অর্ধেক ফসল মাঠে রয়েছে। খালিয়াজুরির কৃষক রুহুল আমিন জানান, তার ৫০ কাঠা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। 

কলমাকান্দা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আগাম বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসনের নির্দেশে কৃষকরা আধাপাকা ধান কাটছেন। তবে শ্রমিক ও জ্বালানি সংকটে শতভাগ ফসল কাটা সম্ভব হয়নি।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওরে দ্রুত পানি বাড়ছে। পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২২ হাজার ৪০৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, বাস্তবে অনেক জমির ধান এখনো মাঠেই রয়েছে।

হবিগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে জেলার ৩৯টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধান ও গ্রীষ্মকালীন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। খোয়াই নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। কুশিয়ারা, কালনী, সুতাং ও সোনাই নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে।

মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জুড়ী নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অব্যাহত বৃষ্টি থাকলে বন্যার আশঙ্কা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সামনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একমাত্র বোরো ফসল হারালে তাদের জীবিকা সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।