নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে, সারাদেশ, অবৈধ বালু উত্তোলন, ছাত্রদল নেতা,
গুমাই নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।   ছবি: আরটিএনএন

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের গলইখালী গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত গুমাই নদীতে অবৈধভাবে দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে দিন-রাত বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছেন মধ্যনগর উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভী। 

এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে রহস্যজনক কারণে উপজেলা প্রশাসন এখনো জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় জনসাধারণ, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গলইখালী গ্রামের উত্তর পাশে গুমাই নদীর তীরবর্তী প্রায় দুই একর সরকারি খাস জমি বর্ষা মৌসুমে পানিতে তলিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে ওই জায়গাটি স্থানীয় কৃষকেরা গবাদিপশু চরানোর কাজে ব্যবহার করতেন। 

সম্প্রতি জায়গাটি উঁচু করার নামে নদীতে দুটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে ভরাট করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় মাস ধরে অবাধে চলা এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন চামরদানী ইউনিয়নের দুগনই গ্রামের বাসিন্দা ও উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও তাদের অভিযোগ।

গলইখালী, পিঁপড়াকান্দা ও তেলিপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বালু ভরাট করা জায়গাটি সরকারি খাস জমি। দীর্ঘদিন ধরে তিন গ্রামের কৃষকেরা এখানে গরু চরাতেন। এখন শুধু বালু উত্তোলনই নয়, নদীর পাড়ের কিছু অংশ কেটে ফেলায় পাড় ভাঙনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

মধ্যনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াশীল আহমেদ বলেন, ‘মধ্যনগরের ভারপ্রাপ্ত ইউএনও সঞ্জয় ঘোষকে একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এতে আমি মর্মাহত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কামাল হোসেন বলেন, ‘গুমাই নদী থেকে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হলেও তা বন্ধে প্রশাসনের নীরবতা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্রুত এই ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ করা উচিত।’

এ বিষয়ে মধ্যনগর সদর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘গলইখালী গ্রামের উত্তর পাশের গুমাই নদীসংলগ্ন এক একর খাস জমি ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের দুগনই গ্রামের আব্দুল আউয়াল তালুকদারের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় এবং নামজারিও করা হয়। তবে তিনি দখল বুঝে নেননি এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত রমজান মাসে তৎকালীন ইউএনও উজ্জ্বল রায়ের নির্দেশে সেখানে গিয়ে আমি দুইদিন ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করেছিলাম।’

অভিযোগ অস্বীকার করে মধ্যনগর উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ওয়াসিফ আলভী বলেন, ‘এখানে আমাদের রেকর্ডীয় দুই একর জায়গা রয়েছে। আমরা গুমাই নদে কোনো ড্রেজার বসাইনি। সরকারি জায়গা বন্দোবস্ত নেওয়ার তথ্যও সঠিক নয়। তাহিরপুর উপজেলা থেকে বালু ও মাটি কিনে এনে জায়গাটি ভরাট করা হচ্ছে। আমাকে জড়িয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’ 

তিনি দাবি করেন, সেখানে জনগণকে কম দামে গ্যাস ও সার সরবরাহের একটি প্রকল্প এবং একটি গরুর খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

ধর্মপাশা উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও সঞ্জয় ঘোষ বলেন, ‘আমার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না এলেও ঘটনাটি নজরে এসেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, ‘প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’

স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের চোখের সামনে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত ড্রেজার সরিয়ে নদী ও সরকারি খাস জমি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।