সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির ঘরে নেই বিএনপির ২০ জন, জামায়াতের ১১ জন ও স্বতন্ত্র ১ জন
সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির ঘরে নেই বিএনপির ২০ জন, জামায়াতের ১১ জন ও স্বতন্ত্র ১ জন।   ছবি: আরটিএনএন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে কারো কারো কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। অন্যদিকে অনেকেরই আর্থিক অবস্থা বেশ সাধারণ মানের। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা বিশ্লেষণ করে নেত্রীদের আর্থিক অবস্থার ভিন্নধর্মী চিত্র পাওয়া গেছে।

হলফনামা অনুযায়ী বিএনপি জোট মনোনীত নিপুণ রায় চৌধুরী, হেলেন জেরিন খান এবং সাবিরা সুলতানার রয়েছে অঢেল সম্পদ। বিপরীতে এমন অনেক প্রার্থী রয়েছেন যাদের বার্ষিক আয় বা অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশ কম। কেউ কেউ এখনো তাদের সঞ্চয় বা আয়ের উৎসের দিক থেকে বেশ সাদামাটা জীবনযাপন করেন। অনেক নারী নেত্রীর হলফনামায় নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স বা জমির পরিমাণ অনেক ধনী প্রার্থীর তুলনায় নগণ্য।

সাধারণত সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সম্পদের হিসাব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, সব প্রার্থীকেই তাদের সম্পদ, দায়-দেনা ও আয়ের উৎসের বিবরণ দিতে হয়েছে। ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রার্থীদের আর্থিক স্বচ্ছতা সম্পর্কে জানার আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এই হলফনামাগুলো কেবল প্রার্থীদের সম্পদই প্রকাশ করছে না, বরং রাজনীতিতে আসা নারীদের অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতাকেও ফুটিয়ে তুলছে।

কোটিপতির ঘরে নেই বিএনপির ২০ জন এবং জামায়াতের ১১ জন এবং স্বতন্ত্র ১ জন। বিএনপির মানসুরা আক্তার, মাধবী মারমা, সেলিনা সুলতানা, সুরাইয়া জেরিন, মোছাম্মৎ ফরিদা ইয়াসমিন, সানজিদা ইয়াসমিন, সুবর্ণা সিকদার, নিলোফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আক্তার, সানসিলা জেবরিন, আরিফা সুলতানা, নাদিয়া পাঠান পাপন, মমতাজ আলো, জীবা আমিনা খান, সাকিলা ফারজানা, রেজেকা সুলতানা, বিলকিস ইসলাম, রেহানা আক্তার রানু, ফাহমিদা হক এবং জহরত আদিব চৌধুরী।

জামায়াত জোটের নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, মারজিয়া বেগম, মোসা. নাজমুন নাহার, মাহফুজা হান্নান, মিসেস সাজেদা সামাদ, শামছুন্নাহার বেগম, মারদিয়া মমতাজ, রোকেয়া বেগম, মাহমুদা আলম মিতু, তাসমিয়া প্রধান এবং মাহবুবা হাকিম। এছাড়া স্বতন্ত্র জোটের সুলতানা জেসমিন।

প্রকাশিত হলফনামা অনুযায়ী সম্পদে পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণ তুলে ধরা হল-

মানসুরা আক্তার: প্রায় ৩২ বছর বয়সী মানসুরা আক্তার স্নাতক করেছেন। একটি মামলা ছিল, মামলা তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন (এফআরটি) অবস্থায় রয়েছে। সম্পদের পরিমাণ ৩ লাখ টাকা।

মাধবী মারমা: ৪৯ বছর বয়সী মাধবী মার্মা পড়েছেন এলএলএম। বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার বেশি, সম্পদ ২১ লাখ টাকার।

সেলিনা সুলতানা: ৪৭ বছর বয়সী সেলিনা সুলতানা এলএলবি, একটি মামলায় খালাস। ৮৩ হাজার টাকা আয় আর সম্পদ সাড়ে ২২ লাখ টাকা।

মোছা. সুরাইয়া জেরিন: ৪১ বছর বয়সী সুরাইয়া জেরিন বিএ পাস। ৬টি মামলায় খালাস। আড়াই লাখ টাকা আয়। আর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকার।

মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন: ৬৪ বছর বয়সী মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন প্রথমবার সংসদ সদস্য হচ্ছেন। তিনি এমএ, বিএড করেছেন। ২০১১ সালের একটি মামলায় খালাস পান গত বছর। বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন: ৩৭ বছর বয়সী মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন এমএ পড়েছেন। একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। ৫ লাখ টাকা বার্ষিক আয় আর সম্পদ রয়েছে ৩৭ লাখ টাকা।

সুবর্ণা সিকদার: ৫২ বছর বয়সী সুবর্ণা সিকদার স্নাতক পাস। বার্ষিক আয় ৭ লাখ ৬৩ হাজার, সম্পদ রয়েছে ৩৯ লাখ টাকার।

নিলোফার চৌধুরী মনি: ৫৬ বছর বয়সী নিলোফার চৌধুরী মনি নবম সংসদের নারী আসনের সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস করেছেন, পেশায় আইনজীবী। কখনো মামলার মুখোমুখি হননি। বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা আর ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।

মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার: ৫২ বছর বয়সী মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার এমএসএস করেছেন, নবম সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন। ৫০ লাখ ২৮ হাজার টাকার সম্পদসহ ৫০ ভরি স্বর্ণ হলফনামায় দেখিয়েছেন তিনি।

সানসিলা জেবরিন: ৩২ বছর বয়সী সানসিলা জেবরিন এমবিবিএস করেছেন, ইংল্যান্ড থেকে এমআরসিএস পড়েছেন। আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রভাষক হিসেবেও ছিলেন। বার্ষিক আয় প্রায় ৭ লাখ টাকা আর সম্পদ রয়েছে ৬৪ লাখ টাকার মতো।

আরিফা সুলতানা: ৪৭ বছর বয়সী আরিফা সুলতানা এলএলএম করেছেন। মামলা ছিল ৬টি, অব্যাহতি পেয়েছেন। আয় ৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা আর সম্পদ ৪৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার।

নাদিয়া পাঠান পাপন: ৪২ বছর বয়সী নাদিয়া পাঠান পাপন অর্থনীতিতে এমএ করেছেন। তিনটি মামলা নিষ্পত্তি রয়েছে। ৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা বার্ষিক আয় আর সম্পদ রয়েছে ৫০ লাখ টাকার বেশি।

মমতাজ আলো: ৫২ বছর মমতাজ আলো স্বশিক্ষিত। ৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আয় আর সম্পদ রয়েছে ৭২ লাখ টাকার।

জীবা আমিনা খান: প্রায় ৬৪ বছর বয়সী জীবা আমিনা খান স্বশিক্ষিত; সংসদ সদস্য হতে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছাড়েন গত ১২ এপ্রিল। ৯টি মামলা চলমান; কোনোটা উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত বা জামিনে রয়েছেন তিনি। বার্ষিক আয় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ আর সম্পদ রয়েছে ৮০ লাখ টাকার।

সাকিলা ফারজানা: প্রথমবার সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন সাড়ে ৪৮ বছর বয়সী সাকিলা ফারজানা, এ আইনজীবী বার এট ল’ করেছেন। দুটো মামলায় খালাস পেয়েছেন। বার্ষিক আয় সাড়ে ১৪ লাখ টাকার মতো, সম্পদ রয়েছে ৯৪ লাখ টাকার।

রেজেকা সুলতানা: ৪৮ বছর বয়সী রেজেকা সুলতানা করেছেন এলএলবি। ৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা আয় বছরে, আর সম্পদ ৯৭ লাখ টাকার।

বিলকিস ইসলাম: ৭০ বছর বয়সী বিলকিস ইসলাম স্নাতক পাস। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য। নেই কোনো মামলা। বার্ষিক আয় সাড়ে ৬ লাখ টাকার বেশি, আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখানো হয়েছে সাড়ে ৬৪ লাখ টাকা।

রেহেনা আক্তার রানু: বয়স ৫৭ বছর, করেছেন এমএ। সবশেষ ২০১৮ সালের মামলায় খালাস পান ২০২৪ সালে। অষ্টম ও নবম সংসদের সদস্য ছিলেন। প্রায় তিন কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক।

ফাহমিদা হক: ৪৮ বছর বয়সী ফাহমিদা হক বিএসসি পড়েছেন। পেশায় খেল ও বিশ্লেষক। বার্ষিক আয় ৭ লাখ টাকা আর সম্পদ রয়েছে ৬০ লাখ টাকার। আর স্বামীর বার্ষিক আয় ৫৮ লাখ টাকা ও সম্পদ রয়েছে ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার।

জহরত আদিব চৌধুরী: ৪৩ বছর বয়সী জহরত আদিব চৌধুরী বার এট ল’ করেছেন। বার্ষিক আয় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে চাকরি থেকে গেল বছর ডিসেম্বরে পদত্যাগ করেন, তা থেকে আয় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার। আর সম্পদ রয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকার।

জামায়াত জোটের-

রোকেয়া বেগম: ৪৮ বছর বয়সী রোকেয়া বেগমের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি। নিজের আয় নেই, অধিগ্রহণকালের মূল্যে লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে।

শামছুন্নাহার বেগম: তিনি পড়েছেন বিএসসি, বিএড। বার্ষিক আয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা আর সম্পদ ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

মিসেস সাজেদা সামাদ: ৬২ বছর বয়সী সাজেদা সামাদ এসএসসি পাস। একটি মামলা ছিল, গেল বছর নির্বাহী আদেশে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আড়াই লাখ টাকা আয় বছরে, সম্পদ ১২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার।

মারদিয়া মমতাজ: ৪১ বছর বয়সী মারদিয়া মমতাজ এমএসসি। শিক্ষকতা পেশা থেকে বছরে আয় ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা; সম্পদ রয়েছে ২১ লাখ টাকার।

মোসা. নাজমুন নাহার নীলু: ৫৫ বছর বয়সী নাজমুন নাহার নীলু এমএসসি পাস। আয় দেখানো হয়নি আয়কর রিটার্নে, সম্পদ প্রায় পৌনে ২৩ লাখ টাকার।

মাহমুদা আলম মিতু: ৩৭ বছর বয়সী মাহমুদা আলম মিতু এমবিসিএস ডাক্তার। বছরে ৩ লাখ টাকা আয় আর সম্পদ ২৮ লাখ টাকার।

নূরুন্নিসা সিদ্দীকা: ৬৭ বছর বয়সী নূরুন্নিসা সিদ্দীকা এমএ, বিএড। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। আয় ১ লাখ ৬১ হাজার টাকা, সম্পদ প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

মাহফুজা হান্নান: ৬৬ বছর বয়সী মাহফুজা হান্নান এমএ। আয় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা সম্পদ প্রায় ৩৯ লাখ টাকার।

তাসমিয়া প্রধান: ৪৫ বছর বয়সী তাসমিয়া প্রধান বার এট ল’। প্রায় ৮ লাখ টাকা বার্ষিক আয়; সম্পদ রয়েছে ৬৭ লাখ টাকার।

মারজিয়া বেগম: ৬৮ বছর বয়সী মারজিয়া বেগম এইচএসসি। আয় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, আর সম্পদ ৮৮ লাখ টাকার।

মাহবুবা হাকিম: হলফনামা অস্পষ্টতা থাকায় পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করবে ইসি।

স্বতন্ত্র জোটের সুলতানা জেসমিন: বয়স ৩৪ বছর, শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। সাড়ে ৫ লাখ টাকা বার্ষিক আয় আর সম্পদ সাড়ে ২৮ লাখ টাকার।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ২৬ এপ্রিল, আপিল নিষ্পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ মে।