নোবিপ্রবিতে বইমেলার রঙে সাহিত্য জাগরণ: নতুন প্রজন্মের পাঠের উচ্ছ্বাস,
বইমেলার দৃশ্য।   ছবি: আরটিএনএন

“কে জানিত মানুষ অতীতকে বর্তমানে বন্দী করিবে? অতলস্পর্শ কালসমুদ্রের ওপর কেবল এক-একখানি বই দিয়া সাঁকো বাঁধিয়া দিবে?”— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চিরন্তন উক্তির মতোই বই যেন সময়ের সেতুবন্ধন, জ্ঞান ও অনুভূতির অনিঃশেষ ভাণ্ডার। আর সেই বইকে ঘিরেই তৈরি হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আবহ- বইমেলা, যেখানে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার মিলন ঘটে একসঙ্গে।

এই আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলার দ্বিতীয় আসর ‘বই-সাখী মেলা’। সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাহিত্য ও সহযোগী ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলা ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক উদ্দীপনা।

১২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে চলছে এই বইমেলা। মেলায় দেখা যাচ্ছে বইপ্রেমীদের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি, নানা ঘরানার বইয়ের সমাহার, নতুন বইয়ের মলাটের গন্ধে ভরপুর পরিবেশ এবং সাহিত্যকে ঘিরে প্রাণবন্ত আলোচনা ও আনন্দঘন মুহূর্ত।

পাঠকদের মতে, বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার স্থান নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক-পাঠক, লেখক এবং প্রকাশকের এক অনন্য মিলনমেলা। নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করা, পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশে এর ভূমিকা অপরিসীম।

বইমেলায় আসা নোবিপ্রবির ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সেলিনা জিন্নাত বলেন, “গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও যৌথ ক্লাবগুলোর উদ্যোগে প্রাণবন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নতুন-পুরোনো বইয়ের সমাহার ও প্রাণচঞ্চল পরিবেশ বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করে। তবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষ বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, বই পড়া কগনিটিভ বিকাশ, মনোযোগ ও কল্পনাশক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাষায়, “বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।” এমন আয়োজন একাডেমিক জীবনের বাইরে মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

আরেক শিক্ষার্থী পারভেজ বলেন, “বর্তমান সময় অনেকটাই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। আমরা অধিকাংশ সময়ই মোবাইল, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকি, যার ফলে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের বইমেলার আয়োজন আমাদের আবার বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এখানে এসে বই হাতে নেওয়া, পছন্দের বই খুঁজে পাওয়া এবং বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করার মাধ্যমে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়। আমার মনে হয়, এমন আয়োজন নিয়মিত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস আরও বৃদ্ধি পাবে।”

এই ধরনের আয়োজন সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “নোবিপ্রবিতে এই বইমেলার আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাবে। আমরা বিশ্বাস করি, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় বইপাঠ মেধার বিকাশে সহায়ক এবং মননশীলতাকে আরও উন্নত করবে। এতে তারা কর্মক্ষেত্রেও আরও দক্ষ হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননকে প্রস্ফুরিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বইমেলা।”

বৈশাখের এই দিনে উৎসবমুখর এ আয়োজনের প্রশংসা করে তিনি মেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।