বিনা মূল্যে বিতরণের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজে গোপনীয় প্রাক্কলিত দর ফাঁস, ঠিকাদারদের মধ্যে সিন্ডিকেট এবং প্রায় ২৫২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার ঢাকার মতিঝিলে এনসিটিবির কার্যালয়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট টিম এ অভিযান পরিচালনা করে।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. তানজির আহমেদ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযান চলাকালে এনসিটিবি থেকে পাঠ্যবই ছাপার প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছে দুদকের দল। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক প্রাক্কলনের কপি, দাপ্তরিক মূল্যতালিকা এবং এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণী। অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য আরও কিছু প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, সংগৃহীত নথিগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কমিশনের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘পাঠ্যবই ছাপাতে দর ফাঁস, সমঝোতার দরপত্র, বাড়তি ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ঠিকাদারেরা সরকারের নির্ধারিত প্রাক্কলিত দর আগেই জেনে গিয়েছিলেন। পরে সেই দরকে ভিত্তি করে কিছুটা কম-বেশি করে দরপত্র দাখিলের মাধ্যমে কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পাঠ্যবই ছাপার কাজ শুরুর দিকে সরকার একটি প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু সেই দর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ঠিকাদারেরা তা বাড়ানোর জন্য চাপ দেন। পরবর্তী সময়ে এনসিটিবি প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর ঠিকাদারেরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র দাখিল এবং কাজ ভাগাভাগি করে নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ানো এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির ফলে শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপাতেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে ২৫২ কোটি টাকা।
২০২৭ সালে ছাপা হবে প্রায় ৩১ কোটি বই
সরকার প্রতিবছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দিয়ে থাকে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা ২২ কোটির বেশি। বাকি বইগুলো প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য।
এবারের পাঠ্যবই ছাপার কাজে সম্ভাব্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারীর সময়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শুরুতে বাজার যাচাই করে প্রাথমিক স্তরের বইয়ের জন্য প্রতি ফর্মা কাগজের দাপ্তরিক প্রাক্কলিত গড় দর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ টাকা ২৬ পয়সা। একইভাবে মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের জন্য প্রতি ফর্মার দর ধরা হয়েছিল ২ টাকা ৮৫ পয়সা।
প্রাক্কলিত দর কেন গুরুত্বপূর্ণ
দেশের সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কমিটির মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর ঠিক করা হয়। কোনো ঠিকাদার প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি দর দাখিল করলে তিনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে যান। ফলে দরপত্রে অংশ নেওয়া ঠিকাদারদের জন্য প্রাক্কলিত দর আগে থেকে জানতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারেরা সরকারি কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে অনেক সময় এসব প্রাক্কলিত দর সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
বাড়তি ব্যয়ের হিসাব
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার জন্য প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে একই দর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতি ফর্মায় দর বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার জন্য কাগজের প্রয়োজন ধরা হয়েছে ২৫ লাখ রিম। এখানে এক হাজার ফর্মায় এক রিম হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। সেই হিসাবে কাগজের প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় ২৫০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার ক্ষেত্রেও দর কিছুটা বেড়েছে। ২০২৬ সালে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের প্রতি ফর্মার গড় কার্যাদেশের দর ছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ৫৪ পয়সা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, মূলত মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপার কাজ থেকেই অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কৌশল তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন দুদকের অভিযানের মাধ্যমে এসব অভিযোগের নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!