৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা, লক্ষ্য ২৫ লাখ কর্মসংস্থান
বাংলাদেশ ব্যাংক।   ফাইল ছবি

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের ধীরগতি, ব্যাংক খাতের চাপ, শিল্পে উৎপাদন হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের সংকট কাটাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারি খাতকে সচল করা, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা এবং অন্তত ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য।

শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২ শতাংশে। অন্যদিকে, আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থপাচার, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বড় পরিসরের ‘কাউন্টার-সাইক্লিক্যাল’ প্রণোদনা প্রয়োজন। অর্থাৎ, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজারের চাহিদা কমে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার কৌশল নেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের ভিত্তিতে গঠিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে। এ অর্থ তিন বছরের বেশি মেয়াদি আমানতের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ সুদে সংগ্রহ করা হবে।

অন্যদিকে, বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে, যা সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।

সবচেয়ে বেশি ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবাখাতের জন্য। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি হাবে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত বিভিন্ন স্কিমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে ৫ হাজার কোটি, চামড়া ও জুতা রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি এবং হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, পরিবেশবান্ধব পণ্য, স্টার্টআপ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির জন্যও পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়াতে ১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ স্কিমও থাকছে।

এই প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া সিএমএসএমই খাতে ৫ লাখ, বন্ধ শিল্পকারখানায় ২ লাখ এবং কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে আরও ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই প্রণোদনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু হবে, রপ্তানি আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ার মাধ্যমে মধ্যমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।