গলি, সড়ক, মহাসড়ক পেরিয়ে ফ্লাইওভারেও উঠে পড়ছে অটোরিকশা
গলি, সড়ক, মহাসড়ক পেরিয়ে ফ্লাইওভারেও উঠে পড়ছে অটোরিকশা।   ছবি: আরটিএনএন

সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজধানীসহ সারাদেশে বাছ-বিচারহীনভাবে চলাচল করছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক। একই সঙ্গে সড়ক ও গলি ভেদাভেদ ভুলে তুলছে বেপরোয়া গতি। ফলে নগরজীবনে তীব্র যানজট ও চরম ভোগান্তির পাশাপাশি দিন দিন বেড়ে চলেছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিবন্ধনবিহীন এসব অটোরিকশা ট্রাফিক আইন অমান্য করে অলিগলি পেরিয়ে এখন মূল সড়ক ও মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। উল্টো পথে চলাচল, দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম এবং চালকদের অদক্ষতার কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ১০০টি ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে, যার বড় একটি অংশে অটোরিকশা জড়িত। তবে এসব ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হওয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয় না। 

দেশে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ। অধিকাংশ চালকই অপ্রশিক্ষিত হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসআ) ও বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ। অধিকাংশ চালকই অপ্রশিক্ষিত হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। সূত্রমতে, সারাদেশে প্রতিদিন ১১ কোটিরও বেশি মানুষ এসব যান ব্যবহার করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষের চলাচলের বিপরীতে ঢাকায় রাস্তা রয়েছে মোট আয়তনের মাত্র ৭-৮ শতাংশ। এই সীমিত অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যা যানজট ও সড়ক শৃঙ্খলাকে আরও জটিল করে তুলছে।

উল্টো পথে ঢুকে যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায় অটোরিকশা।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ অটোরিকশা তৈরির কারখানা। মোহাম্মদপুর, বসিলা, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, মুগদা, মান্ডা, কমলাপুর, তেজগাঁও, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় ওয়ার্কশপে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অটোরিকশা। চীন থেকে আমদানিকৃত ব্যাটারি ও মোটরের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি যন্ত্রাংশ যুক্ত করে এসব যান প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান না থাকায় এসব কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। কম বিনিয়োগে বেশি মুনাফার আশায় গড়ে উঠছে নতুন নতুন অবৈধ অটোরিকশা উৎপাদনকেন্দ্র।

 “অটোরিকশা বন্ধ করলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়বে। আমাদেরকে না ধরে যেখানে অটোরিকশাগুলো তৈরি হয় সেই কারখানাগুলো বন্ধ করুক। অথচ সেখানে কোনো অভিযান চালায় না পুলিশ।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক জানান, প্রতিদিন ৩৫০ টাকা জমা দিয়ে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করেন তিনি। ব্যাটারিচালিত ছাড়া বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার রিকশায় উঠতে চায় না। কারণ ওগুলোতে সময় বেশি লাগে। তবে লাইসেন্স না থাকায় পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়। পুলিশ ধরলেই ১২০০ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। তার মতে, লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা হলে এ সমস্যা অনেকটাই কমে আসত।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ থেকে আসা চালক হোসেন আলী বলেন, অটোরিকশা বন্ধ করলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়বে। হোসেন বলেন, আমাদেরকে না ধরে যেখানে অটোরিকশাগুলো তৈরি হয় সেই কারখানাগুলো বন্ধ করুক। অথচ সেখানে কোনো অভিযান চালায় না পুলিশ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি। 

বেপরোয়া অবৈধ অটোরিকশা বন্ধ ও নিয়ন্ত্রণে মহানগর পুলিশের ভূমিকা কী, জানতে চাইলে  ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) এন এম নাসিরুদ্দিন সংবাদমাধ্যম আরটিএনএন’কে জানান, এসব অটোরিকশা অনুমোদনহীন এবং চালকরাও প্রশিক্ষিত নন। ফলে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। ডিএমপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অটোরিকশা তৈরির কারখানা বন্ধ এবং বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

এই সমস্যা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়; জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বাজারগুলোতেও একই চিত্র। একটি মাঝারি উপজেলা বাজারে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১৫০০ অটোরিকশা প্রবেশ করায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বাড়ছে জনদুর্ভোগ।

সড়ক-মহাসড়কে অটেরিকশা চলাচলকে পরিবহন শৃঙ্খলার জন্য হুমকি ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর মহাসচিব লিটন এরশাদ। দীর্ঘদিন বিষয়টি সুরাহায় কাজ করে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদনহীন অবৈধ অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার বেপরোয়া ও ভয়াবহতা  নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মিটিংএ প্রশাসনকে বলে আসছিলাম। এর বিকল্প কোন নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ বাহন চালু করার বিষয়েও আমরা বিভিন্ন সময়ে পুলিশ প্রশাসনকে  উৎসাহ দিয়েছিলাম। তবে বিভিন্ন প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণে পুলিশ এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
সড়ক-মহাসড়ককে অটোরিকশা মুক্ত করে নিরাপদ বলয়ের মধ্যে আনতে হবে উল্লেখ করেন তিনি। লিটন এরশাদ মনে করেন একমাত্র রাজনৈতিক সরকারের সদিচ্ছাই এই সমস্যার সমাধানসহ সড়কে শৃংখলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পার। সেজন্য সড়ক মন্ত্রণালয়, পরিবহন খাত, সড়ক বিশেষজ্ঞ, সড়ক আন্দোলন কর্মীদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন দিনি। 

নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগেঠনগুলোর মতে, অবৈধ অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর নীতিমালা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।