তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। ভোরের আলো ওঠার পর থেকেই যেন আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। এই দাবদাহে সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন কাটছে শ্রমজীবী মানুষের-যাদের কাজ থেমে থাকে না, জীবন চলে দৈনিক আয়ের ওপর।
রাজধানীর সড়কে বিশ বছর ধরে রিকশা চালান কুমিল্লার আব্দুল মালেক। তিনি সকাল থেকেই যাত্রী তুলতে বের হন। কিন্তু তীব্র রোদের কারণে রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি কম, যাত্রীও মেলে কম। তবুও থামার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “গরমে শরীর আর চলে না, মাথা ঘোরে, ঘামে চোখ জ্বালা-পোড়া করে। কিন্তু কাজ না করলে খাওয়ামু কি? আগে সাত-আট ঘণ্টা রাস্তায় থাকতে পারলেও এখন বেশিক্ষণ থাকা যায় না। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কিছু সময় চালাই। আগে দৈনিক তেরশ টাকা আয় হলেও এখন আরও দুই-চারশ কম হয়। এদিকে মহাজনকে দেড়শ টাকা দিতেই হয়।”
গুলিস্তান থেকে বাড্ডা পর্যন্ত ভ্যান চালিয়ে মালামাল পৌঁছে দেওয়া এক শ্রমিক জানান, “আগে দিনে ১২-১৪শ টাকা আয় করতাম। এখন গরমে শরীরই থাকে না। ৬০০ টাকা কামাই করার পর আর কাজ করা যায় না।”
তিনি বলেন, কাজের ফাঁকে বারবার বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। “এই আসতে আসতেই দুই-তিনবার রেস্ট নিতে হইছে। একটু কাজ করি, আবার বসে পড়ি। রোদের মধ্যে দাঁড়ানোই কষ্ট।”
গরমে পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। “আগে ৩০-৫০ টাকার মধ্যে পানি-খাবার হইতো। এখন ছয় গ্লাস পানি, কলা, কেক, আবার স্যালাইন-সব মিলিয়ে ১০০ টাকার উপরে খরচ হইয়া যায়,” বলেন তিনি।
একই অবস্থা দিনমজুরদের। নির্মাণ শ্রমিকরা খোলা আকাশের নিচে মাথায় গামছা বেঁধে কাজ করছেন। দুপুরের প্রখর রোদে কাজ কিছুটা কমিয়ে আনলেও পুরোপুরি বন্ধ রাখা সম্ভব হয় না। কারণ, কাজ না করলে মজুরি নেই। ফলে তীব্র গরমে ক্লান্ত শরীর নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাদের।
নির্মাণ শ্রমিক সাইফুল জানান, বেশিরভাগ সময়ই তাদের রোদে কাজ করতে হয়, তাই কষ্টের মাত্রাও বেশি।
হকারদের অবস্থাও করুণ। রাস্তায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কেউ পানিশূন্যতায় ভুগছেন, কেউ মাথা ঘোরা বা বমির মতো সমস্যায় পড়ছেন।
নয়াপল্টনে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন ইসমাইল হোসেন। তিনি জানান, কাঠফাটা রোদে দাঁড়িয়ে তিন ঘণ্টা ধরে সবজি বিক্রি করতে হয়। রোদের কারণে সবজি দ্রুত শুকিয়ে যায়, এতে বিক্রিও কমে যায়। ক্রেতারা শুকনো সবজি কম নিতে চান।
রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার এক কামার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “এমনিতেই সারাদিন কয়লার আগুনে লোহার সঙ্গে আমরাও জ্বলতে থাকি, তার ওপর রোদের তাপে রাস্তার গরমটাও এসে মুখে পড়ে। এতে মুখ প্রচণ্ড জ্বালা-পোড়া করে। এদিকে কাস্টমারের চাহিদাও পূরণ করতে হয়।”
অন্যদিকে রাজধানীর ফুটপাতে ডাব, শরবত ও তরমুজ বিক্রেতাদের রোদে কষ্ট হলেও বেচাবিক্রি ভালো। তাই তারা বলছেন, কষ্ট হলেও সন্তুষ্ট আছেন।
খিলগাঁওয়ের এক শরবত বিক্রেতা জানান, তীব্র গরমে ঠান্ডা পানির ব্যবসা বেড়ে গেছে। যেখানে আগে দিনে ২০০ গ্লাস বিক্রি হতো, এখন সেখানে ৩০০-৪০০, এমনকি ৫০০ গ্লাস পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গরম যত বাড়ছে, ঠান্ডা পানির চাহিদাও তত বাড়ছে।
তার ভাষায়, “গরম না থাকলে ব্যবসা নাই, গরম থাকলেই বিক্রি বাড়ে।” এই তাপদাহে রাস্তায় চলাচলকারী মানুষ-রিকশাচালক, গাড়িচালক, হকার, পথচারী-সবাই তৃষ্ণা মেটাতে ভিড় করছেন ঠান্ডা পানির দোকানে।
বিশেষ করে দুপুরের দিকে বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি যেন এই গরমে সাময়িক স্বস্তির একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন বাইরে কাজ করা মানুষজন। পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং সম্ভব হলে দুপুরের সময় কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো-জীবিকার তাগিদে এই পরামর্শ অনেকের পক্ষেই মানা সম্ভব হয় না।
তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের দিন যেন এক কঠিন সংগ্রামের নাম। রোদ, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার মাঝেই তারা প্রতিদিন লড়াই করে চলেছেন-শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!