২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এক প্রকার নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে। ১২টি সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণের পর বর্তমানে এগুলো সরকারি প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হওয়ায় দ্রুত নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সরকারের ৪ হাজার ৬৫৩টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন উপযোগী হচ্ছে চলতি বছরই। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই আলোচনায় রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ না দেখালেও আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে সংস্থাটি। ভোট গ্রহণ দলীয় নাকি নির্দলীয় প্রতীকে হবে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো ভেঙে দেয়। দেড় বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হয়েছে।
শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলো বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত অধিকাংশ চেয়ারম্যান পলাতক থাকায় সেখানেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নাগরিকদের।
চলতি বছর ও আগামী বছরের মধ্যে বেশিরভাগ নির্বাচন হয়ে যাবে বলে জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সাংবাদিকদের বলেন, 'কমিশন বিচার-বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট সব ধরনের আইনকানুনের ওপর ভিত্তি করেই সব সিদ্ধান্ত নেবো। ইচ্ছা করলে আমরা অল্প সময়ের ভেতর সব নির্বাচন করতে পারবো, সে সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে।'
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ড. ইউনূস সরকার দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাদ দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ক্ষমতাসীন দল বলছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সংসদে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচনের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ছাড়া গ্রামের সম্প্রীতির ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে দলীয় প্রতীক তুলে দিয়ে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভোটকে উৎসবে পরিণত করা এবং গ্রামীণ সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনা উচিত। দলীয় প্রতীকে ভোট না হলে যোগ্য প্রার্থীরা জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাবেন বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কাজ চলছে। নিঃসন্দেহে এ বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক দিলেও নতুন করে আর প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে এডিসি ও ইউএনওরা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবেন।
সরকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গরম ও বর্ষার মধ্যে ভোটাররা ভোট দিতে উৎসাহবোধ করেন না। এপ্রিল থেকে জুলাই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা রয়েছে। এরপর বর্ষাকাল শুরু হবে। এসব দিক বিবেচনা করে শীতের সময়টিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনে বলা আছে, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পরিষদের প্রথম সভার পর থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ২০২১ সালের ২১ জুন প্রথম ধাপে ২০৪ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৮৩৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপে এক হাজার চারটি ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত। একই বছরে ২৭ ডিসেম্বর। ৮৩৬টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্চম ধাপে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি ৭০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে। প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের মেয়াদ হয়েছে। ধাপে ধাপে এসব ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদত হোসেন। আর বাকি ১১টি সিটি করপোরেশনে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল বিগত সরকার। এরপর ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অনেক ইউনিয়ন পরিষদও হয়ে পড়েছে জনপ্রতিনিধিহীন। ফলে প্রায় ১৯ মাস ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া চলছে প্রায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। ঈদের আগে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেন বর্তমান সরকার। যদিও একে নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতি ও প্রশাসন দখলের চেষ্টা হিসেবে দেখছে বিরোধী দলগুলো।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!