নারী দিবস, আন্তর্জাতিক
বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।   ছবি: সংগৃহীত

আজ ৮ মার্চ, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটি কেবল উদযাপনের নয়, বরং নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য— ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—সব নারীর জন্য হোক’।

এই প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয়, সমতার পথে অনেক অগ্রগতি হলেও এখনো বিশ্বের অসংখ্য নারী মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই শুধু প্রতীকী সম্মান নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন ও কার্যকর পদক্ষেপ।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারী শ্রমিকেরা কর্মঘণ্টা কমানো, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব ওঠে। এরপর ১৯১১ সালে কয়েকটি দেশে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তখন থেকেই দিনটি নারীর অধিকার ও সমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

এবারের প্রতিপাদ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—অধিকার, ন্যায়বিচার ও উদ্যোগ। অধিকার মানে কেবল আইনি স্বীকৃতি নয়, বাস্তবে সেই অধিকার ভোগের সুযোগ নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা—এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে নারীর উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। এখনও বিশ্বের অনেক স্থানে নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পান না, সমান কাজের জন্য সমান মজুরি থেকেও বঞ্চিত হন।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গার্হস্থ্য সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলো শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব।

অন্যদিকে উদ্যোগ বলতে বোঝায় নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া। প্রশিক্ষণ, অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি—এসবই নারীর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে লাখো নারী শ্রমিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং জাতীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষা ক্ষেত্রেও মেয়েদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে এখনো বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক কুসংস্কারের মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তাই এবারের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে নারীর উন্নয়ন টেকসই হয় না।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নারীর অগ্রগতি মানে পুরো সমাজের অগ্রগতি। পরিবারে সমান দায়িত্ব বণ্টন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীন পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে বড় করে তোলা এবং তাদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ তৈরি করাই পারে একটি সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে।