বাহারী রঙ, আঁকাবাঁকা তুলির আঁচড়, নৈপুণ্যতার ছোঁয়ার সাথে হাড়ভাঙা পরিশ্রম। ফলাফল চক্ষু শীতল তৈজস। নাম তার শখের হাঁড়ি। বংশপরম্পরায় শতশত বছর ধরে এ হাঁড়ির কারিগর রাজশাহীর গোদাগারী উপজেলার বসন্তপুরের বাসিন্দা, পাল বংশের সুশান্ত কুমার পাল।
সঠিক ব্যবস্থাপনা, বিপণন ও বিক্রির অভাবে স্বর্ণপদকসহ ২৪টি পদক পাওয়া এ শখের হাঁড়ি আজ বিলুপ্তির পথে। কারিগররা কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন। সুদিন না ফিরলে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে এ সমৃদ্ধ পণ্যটি, শঙ্কা সুশান্তের।
বাবা ভোলানাথের মাধ্যমে সেই ছোট্ট বেলায় শখের হাঁড়ি তৈরিতে হাতেখড়ি হয় তার। বাবা স্বপ্ন দেখতেন একসময় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হবে তাদের হাতের যাদুতে তৈরি সুন্দর সুন্দর হাঁড়িগুলো। সেই দায়িত্বপালনে বদ্ধপরিকর ছিলেন সুশান্ত। পরিশ্রম এবং নৈপুণ্যতার ছাপ রেখে পেয়েছেন কাঙ্খিত ফলাফলও। অর্জন করেছেন ১৮টি দক্ষ কারিগর পুরুষ্কার, ৪টি শ্রেষ্ঠ কারুশিল্প পুরুষ্কার, ১টি স্বর্ণপদক, শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীন আজীবন সম্মাননা।
ঝুলিতে উঠেছে কারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩২টি সনদ। শখের হাঁড়ির গল্প জায়গা পেয়েছে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের পাতাতেও। হাঁড়িটি নিয়ে বিদেশের মাটিতে (জাপানে) করেছেন দেশের কারুশিল্পের প্রতিনিধিত্ব।
সম্মাননা আর পুরুস্কারে ঝুলি ভরলেও সুদিন ফেরেনি সুশান্তের। সাময়িক ভালো থাকলেও বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বিক্রি না থাকায় সোনারগাওয়ে কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে নেওয়া স্টল বন্ধ রেখে এলাকার হাটেবাজারে মাটির তৈজস বিক্রি করে চলছেন কোনো মতে।
মূলত বৈশাখী মেলা, বাণিজ্য মেলা, রথের মেলা, কুঠির শিল্প মেলাসহ নানাবিধ মেলাগুলো এ হাঁড়ি বিক্রির প্রধান মাধ্যম। রাজশাহীর স্থানীয় পর্যায়ে তেমন চাহিদা না থাকলেও ঢাকাসহ অন্যান্য বিভিন্ন মেলাতে বেশ চাহিদা ছিল হাঁড়িগুলোর। তবে দেশে করোনা মহামারী আসার পর থেকে দেশে মেলা হচ্ছে অতিশয় অল্প। গত দুইবছরে তা নেমেছে শূন্যের কোঠায়। ফলে বেচাকেনায় আকাল পড়েছে। যা চরম বেপাকে ফেলেছে তাদেরকে।
দুইবছর ধরে স্টল ভাড়া বকেয়া এমনকি খাওয়ার টাকার ব্যবসাও হচ্ছে না দাবি করে এই গুণি শিল্পী বলেন, ‘পরিবার নিয়ে চরম দূর্দশায় জীবন কাটছে আমার। করোনা আসার পর থেকে আমরা বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছি। প্রচুর মাল আছে, বেচাকেনা নাই। লোক কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ভেতরে স্টল আছে। দুই বছর থেকে ভাড়া দিতে পারছি না। সবমিলিয়ে নানা সমস্যা এবং অসহায়ত্বের মধ্যে আছি। জীবনে যুদ্ধই করে গেলাম’।
নাম পেলেও স্বচ্ছলতা আসেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘নামের দিক দিয়ে যা চেয়েছি তার থেকেও অনেক বেশি পেয়েছি। কিন্তু আমার প্রজন্ম হুমকির মুখে। তাদের সবাইকে এই কাজ শিখিয়েছি। তারা কি করে খাবে তাদেরকে রক্ষা করতে পারছি না। শখের হাঁড়ি নিয়ে দেশের প্রায় সব মিডিয়াতে রিপোর্ট হয়েছে। এমনকি বিটিভিতেও রিপোর্ট হয়েছে। বইয়ের পাতায়ও নাম এসেছে কিন্তু আসেনি স্বচ্ছলতা।
সবাই হাঁড়ি নিয়ে ভাবলেও আমাদের পেটে ভাত জোটে না, এটা কেউ ভাবে না। যা বিক্রি হয় তাতে খাবারের টাকাও হয় না। তাই মেলা বা যোগযাত্রা না হলে বেশির ভাগ সময় স্টল বন্ধ থাকছে। প্রচুর মাল আছে, তৈরিও হচ্ছে তবে বিক্রি নাই। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘না পারছি ছেড়ে দিতে না পারছি কর্ম করতে। এভাবে চলতে থাকলে বিলুপ্তির পথে আগাবে শখের হাঁড়ি’।
পোড়ামাটির শিল্পের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে জানিয়ে সুশান্ত বলেন, রাজশাহীতে আরো সাড়ে ৪ হাজার কারিগর একসময় এ পেশায় নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় গুটিকয়েক কারিগর ছাড়া সবাই ছেড়ে দিয়েছে। আগে নিত্য ব্যবহারের জন্য মাটির তৈরি তৈজস ব্যবহার করা হতো। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী বাজারে আসায় মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা অনেক কম।
বিপদজনক অবস্থায় মাটির তৈরি জিনিসপত্র। হাড়িঁ, কলসি, বদনা, গুঁড়ের হাঁড়ি, মুড়ির হাঁড়ি, ঝাঝর এগুলো বানাতাম আমরা। এরশাদের আমলের শেষ সময়ে এসে শখের হাঁড়ির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া শুরু হয়। বর্তমানে এলাকার বাজার ঘাটে যেসব জিনিস চলে সেগুলো বানায়ে কোনোমতে টিকে আছে কারিগররা।
প্রকৃত কারুশিল্পীরা অবহেলিত অভিযোগ করে তিনি বলেন, কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের স্টলগুলোতে কারুশিল্পীর নামে অনেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার রকম জিনিস কিনে এনে বিক্রি করে। এসব বিক্রিকারীরা ফুলেফেপে উঠলেও প্রকৃত কারুশিল্পীরা অবহেলিত এবং ্একরকম জিনিস বিক্রি করায় খাবার টাকাটাও রোজগার হয় না।
শখের হাঁড়ির উত্থানের কথা বলতে গিয়ে সুশান্ত বলেন, ‘রাজশাহীর বাইরে এ হাঁড়ির জনপ্রিয়তা পেতে ভূমিকা রাখেন রাজশাহী বিসিক-এর নকশাবিদ আলাউদ্দিন। তিনি হাঁড়িগুলো পছন্দ করতেন। ঢাকার বিজয়সরণীতে এক মেলায় পণ্যটির প্রদর্শনী এবং বিক্রির সুযোগ করে দেন। সেখানে ব্যাপক বিক্রির পাশাপাশি মেলে বেশ জনপ্রিয়তা। সেই থেকে শুরু হয় গ্রামবাংলা থেকে ঢাকায় উঠে আসা শখের হাঁড়ির সুদিন’। এসময় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘর, লোক কারুশিল্প যাদুঘরে, চারুকলা বিভাগে, বাংলা অ্যাকাডেমী, চীনমৈত্রী সম্মেলনসহ বিভিন্ন জায়গায় মেলাতে অংশগ্রহণ করতেন বলে জানান সুশান্ত।
সুশান্ত জানান, কেবল দেশে নয় দেশের বাইরেও পৌঁছেছে শখের হাঁড়ি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাপানেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে হাঁড়িটি। প্রবাসী বাঙালিদের আয়োজনে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও গণমাধ্যমের কাছে পান নৈপুণ্যেখচিত সেরা নকশিহাঁড়ির উপাধি।
সমৃদ্ধ এ পণ্যটি ধরে রাখতেন চান সুশান্ত। এজন্য শখের হাঁড়ির প্রধান এ কারিগর ছোটবেলা থেকে নিজের বড় ছেলে সঞ্জয় এবং ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয়কে কাজটি শিখিয়েছেন। মেয়ে সুচিত্রা এবং দুই ছেলের বউও হয়েছেন বেশ দক্ষ। তারাও বাপ-দাদার এই শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তাদেরকে নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন বলে আক্ষেপ জানিয়েছেন তিনি।
তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিপনন নিয়ে কাজ করা গেলে নিজ এলাকায় অবহেলিত সমৃদ্ধ এ পণ্যটি রাজশাহীসহ সারাদেশ ব্যাপক চাহিদা তৈরি হতে পারে এমন আশাও দেখছেন বয়োজৈষ্ঠ্য কারিগর সুশান্ত। সরকার এবং সংশ্লিষ্ঠ সকলের দৃষ্ঠি আকর্ষণ করেছেন তিনি।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!