ইরান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এবার হামলা হলে ইরানের পাল্টা জবাব হবে আরও ব্যাপক ও অনিশ্চিত। সংশোধিত সামরিক কৌশল, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র এবং আগের দফার সংঘাতে হামলার শিকার হওয়া স্থাপনাগুলোর বাইরেও নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তেহরান।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই খবর প্রকাশিত হয়েছে, চলতি মাসের গোড়ার দিকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের বোমা হামলা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে তাতে আপত্তি জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সাদেক আলিজাদেহ লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবকে বলেন, ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ৪০ দিনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ ও নৌবাহিনীর পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি জানান, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের কিছু অস্ত্রেরও উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রকে মডিউলার ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে, যেগুলো ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। নতুন ব্যবস্থায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র আরও দ্রুত সক্রিয় করা যাবে এবং এগুলো ব্যবহারে রসদ ও সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতাও কম হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যবহৃত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রেও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সামরিক মহড়াগুলোর একটি উদ্দেশ্য ছিল এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা পরীক্ষা করা।
আলিজাদেহ আরও বলেন, মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র কেনার সম্ভাবনা নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে হাইপারসনিক বা অতিধ্বনির গতিসম্পন্ন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, এ ধরনের অস্ত্রের গতিপথ হবে আরও জটিল, ফলে সেগুলোকে মাঝপথে প্রতিহত করা কঠিন হবে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় কম।
আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার হোসেইন কানানি মোগাদ্দাম বলেন, নতুন করে কোনো হামলা হলে ইরানের জবাব আগের সংঘাতগুলোতে দেখা পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর হুঁশিয়ারি, ইরানের অভিযান শুধু মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলি অবস্থানগুলোকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হবে না, বরং আরও দূরের স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তিনি বিশেষভাবে ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহর এবং দেশটির দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া ইরানের এমন কিছু অস্ত্র ব্যবহারের কথাও তিনি বলেন, যেগুলো আগে কখনো মোতায়েন করা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর ভাষায়, শক্তিশালী তড়িৎচুম্বকীয় বোমা এবং ‘রাস্তাখিজ’ বা ‘পুনরুত্থান’ নামে পরিচিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রধান আলী আবদোল্লাহিও আলাদাভাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে এবার আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, তেহরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো শনাক্ত করা বা মাঝপথে প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
এদিকে ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, আগের দুই যুদ্ধের তুলনায় আরও বেশি ধ্বংসাত্মক একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে ইরান। তবে পরিকল্পনার বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি। আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় ইন্টারনেট কেব্লকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তাঁর হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত পরিসরের সামরিক অভিযানও বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জ্বালানিসংকট সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এড়াতে এবং একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে ইরানে কয়েক দিন ধরে বোমা হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল ইসরায়েল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ইরানি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত নতুন করে উসকে দেওয়ার বিরোধিতা করেন ট্রাম্প। এর পরই শেষ পর্যন্ত অভিযানটি স্থগিত করা হয়। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। প্রস্তাবিত এই অভিযান ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া আগের দফার সংঘাতের তুলনায় আরও তীব্র হওয়ার কথা ছিল। ওই সংঘাত দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছিল।
নতুন অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা ছিল কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা আবার শুরু হওয়া ‘অযৌক্তিক কোনো পরিস্থিতি নয়’। ওই ব্যক্তি বলেন, ‘হয় একটি চুক্তি হবে, নয়তো হামলা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন তেহরানকে একটি সমঝোতা চুক্তিতে নিজেদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর লক্ষ্য হবে যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ইসরায়েল সফরের সময় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানে হামলার লক্ষ্যবস্তুর একটি হালনাগাদ তালিকা মার্কিন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরেন। নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছিল। এতে বেসামরিক অবকাঠামোর এমন কিছু স্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোতে চলতি বছরের শুরুর দিকে হামলা চালানো হয়নি।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের গোড়ার দিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যে হামলার পরিকল্পনা করেছিল, তা ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টার অংশও হতে পারত। ওই সূত্র আরও বলেছে, নতুন করে হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের উপমুখপাত্র আনা কেলি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। সংবাদপত্রটিকে তিনি বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সময়েই ইরানে হামলা চালাবে না। ট্রাম্পও জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না।
একাধিক রণাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়তে পারে নতুন যুদ্ধ
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আগের মতোই একাধিক রণাঙ্গনে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হুতিরা ইতিমধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্তপারের সংঘাতে জড়িত রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধেও অংশ নিচ্ছে তারা। অন্যদিকে, কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকা হিজবুল্লাহও নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রীরা লেবাননকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের পক্ষে হিজবুল্লাহ যুদ্ধে যোগ দিলে দেশটিকে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হবে। এর মধ্যে দক্ষিণ লেবাননের দখল করা ভূখণ্ড আরও সম্প্রসারণ এবং বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে আবারও বোমাবর্ষণ শুরু করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইতিমধ্যে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একাধিক ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে। এর জবাবে এসব গোষ্ঠী ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!