জামিল লিমন-নাহিদা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহ
জামিল লিমন-নাহিদা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হিশাম আবুগারবিয়েহ   ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা (ইউএসএফ)-এ পড়াশোনা করা দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য ও চাঞ্চল্য। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো এই দুই শিক্ষার্থীর জীবন শেষ হয়েছে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে, যা পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিকে গভীর শোকে ডুবিয়েছে।

গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ফ্লোরিডার চারটি কাউন্টির পুলিশ এবং বিভিন্ন সংস্থা তাদের সন্ধানে অভিযান চালায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, মায়ামিও নিয়মিতভাবে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। প্রায় ১০ দিন পর তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তদন্তে জানা যায়, হিশামই ছিলেন জামিল লিমনের রুমমেট। পুলিশ তার তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। পরে হিশামের বাসা থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা ও পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নাহিদা বৃষ্টির মৃত্যুও নিশ্চিত হয় বলে জানায় তার পরিবার। যদিও বৃষ্টির মরদেহের বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

তদন্তকারীরা এখন এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ খতিয়ে দেখছেন। প্রশ্ন উঠছে, দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন নির্মম মৃত্যুর পেছনে কি ব্যক্তিগত আক্রোশ ছিল, নাকি আরও গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক বা অপরাধমূলক কারণ জড়িত রয়েছে। পুলিশ এ বিষয়ে হিশামকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

হিশামকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ছিল নাটকীয়। টাম্পার উত্তরে তার বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগে পুলিশ গেলে তিনি নিজেকে ঘরের ভেতর অস্ত্রসহ অবরুদ্ধ করে ফেলেন। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোয়াট (SWAT) টিম মোতায়েন করা হয়। পরে পুলিশের চাপে তিনি আত্মসমর্পণ করেন।

আদালত ও শেরিফ অফিসের নথি অনুযায়ী, হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহ ইউএসএফ-এর সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক সহিংসতার অভিযোগ ছিল, যার মধ্যে রয়েছে শারীরিক আঘাত এবং চুরির মামলা। এছাড়া পারিবারিক সুরক্ষার জন্য তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আবেদনও করা হয়েছিল।

বর্তমানে হিশামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুর খবর গোপন করা, অবৈধভাবে মৃতদেহ সরানো, আলামত নষ্ট করা, পারিবারিক সহিংসতা এবং শারীরিক আঘাতের অভিযোগ।

এদিকে পুরো ঘটনাটি ঘিরে ইউএসএফ এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কমিউনিটির সদস্যরা বলছেন, লিমন ও বৃষ্টি দুজনই অত্যন্ত মেধাবী ও সামাজিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি তারা বিভিন্ন কমিউনিটি কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, মায়ামির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা শুরু থেকেই স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং তদন্তে সহযোগিতা করছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে গভীর শোক নেমে এসেছে। স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতি শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো প্রবাসী সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনার রহস্য আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।