জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর ধরে চলছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি শোধন, রিভার্স অসমোসিস (RO) প্ল্যান্ট, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (PSF) ও সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। তবে প্রকল্প বাড়লেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষ করে শ্যামনগরের গাবুরা এবং কালিগঞ্জের কালিঞ্চি এলাকায় পরিস্থিতি এখনও নাজুক। লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পানির উৎসগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি বলেছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আজকের পদক্ষেপই আগামীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তিনি জানান, সরকার জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩-২০৫০ এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC 3.0) প্রণয়ন করেছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-নিঃসরণ উন্নয়ন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন জোরদারেও কাজ চলছে।
কিন্তু নীতি ও প্রকল্পের এই উদ্যোগের সঙ্গে উপকূলের বাস্তবতার ব্যবধান এখনো বড়।
সাতক্ষীরায় সুপেয় পানি নিশ্চিতে চলছে Satkhira Resilient Water System Pilot Project। সেভ দ্য চিলড্রেন ও উত্তরণের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটির আওতায় RO প্ল্যান্ট স্থাপন এবং PSF পুনর্সংস্কার করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পেয়েছেন। কমেছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। কমেছে পানি কেনার খরচও।
প্রকল্পটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও নারী ওয়াটার ইউজার গ্রুপের মাধ্যমে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় নারীরাও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত হয়েছেন।
ব্র্যাকের Rain for Life প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সৌরবিদ্যুৎচালিত সুপেয় পানির প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে। কেয়ার বাংলাদেশ ও ডিএসকে-এর নবাবল্লভ প্রকল্পেও উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।
তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অপ্রতুল। শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো সংকটপূর্ণ এলাকায় পানি সংগ্রহের বুথ বা কালেকশন পয়েন্টের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় কম। অনেক এলাকায় বসানো PSF ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
গাবুরার চিত্র আরও কঠিন। নদীবেষ্টিত এই এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেশি। ফলে সাধারণ নলকূপ প্রায় অকার্যকর। পুরোনো অনেক PSF ও পানি শোধনাগারও এখন বন্ধ। শুষ্ক মৌসুমে পুকুর শুকিয়ে গেলে সচল প্ল্যান্টগুলোও পানি দিতে পারে না।
তবে নতুন উদ্যোগও আছে। গাবুরার সোরা গ্রামে রূপান্তর ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের অর্থায়নে ‘সুন্দরবন নারী দল সুপেয় পানি প্ল্যান্ট’ চালু হয়েছে। নারী নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। এরপরও অনেক পরিবারকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। কেউ কেউ চড়া দামে ফিল্টারের পানি কিনছেন।
কালিঞ্চিতেও একই চিত্র। DPHE ও বিভিন্ন এনজিওর সীমিতসংখ্যক RO এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় স্থানীয়দের। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়।
এই দুই এলাকায় WaterAid Bangladesh, Rupantar, BONDHU, Save the Children, Uttaran, Friendship, PROBAHO এবং UNDPসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তাদের উদ্যোগে পানি সরবরাহ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনের সুযোগ বাড়ছে।
তবু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে। উচ্চ লবণাক্ততায় সাধারণ ফিল্টার দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। কোথাও পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে প্ল্যান্ট বন্ধ। আবার কোথাও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
তাই শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বড় পরিসরে লবণাক্ততা দূরীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার NAP ২০২৩-২০৫০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনার সফলতা যাচাইয়ের সময় মাঠে। সাতক্ষীরার উপকূলের মানুষের কাছে সেই সাফল্যের মাপকাঠি খুব সহজ—প্রকল্পের সংখ্যা নয়, প্রতিদিন ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছাচ্ছে কি না।
উপকূলের মানুষের কাছে এখন একটি কলসি সুপেয় পানিও উন্নয়নের বড় সূচক। তাই জলবায়ু অভিযোজনের অর্থ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়। সেই অবকাঠামো কতদিন সচল থাকে এবং কত মানুষ নিয়মিত নিরাপদ পানি পান—সেটিই হতে হবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
News magazine bootstrap themes!
I like this themes, fast loading and look profesional
Thank you Carlos!
You're welcome!
Please support me with give positive rating!
Yes Sure!