সুপেয় পানির সংকটে বিপন্ন জীবন-জীবিকা
সুপেয় পানির সংকটে বিপন্ন জীবন-জীবিকা।   ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ৬৯ কিলোমিটার পথ পেরোলে শ্যামনগরের উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো। যেখানে সুপেয় পানির সংকট তীব্র। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন গাবুরা ও কালিঞ্চির বিভিন্ন গ্রামে পরিস্থিতি চরমে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বাংলাদেশের উপকূলে বাড়ছে লবণাক্ত পানির প্রবেশ। ফলে সাতক্ষীরা ও খুলনার মতো উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ধীরে ধীরে বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের এক গবেষণায় এর চিত্র উঠে এসেছে। খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর—এই পাঁচ উপজেলা নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। এতে দেখা যায়, ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পাঁচ উপজেলায় কৃষিজমি কমেছে ৭৮ হাজার ১৭ একর। বিপরীতে লবণ পানিনির্ভর চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৯ একর।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, এসব এলাকায় কর্মসংস্থান কমছে। বাড়ছে খাওয়ার পানির সংকট। শিক্ষাতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারী ও শিশুরা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন ও জীবিকা।

খুলনার দাকোপ উপজেলার গুনারি গ্রামের চিত্র আরও কঠিন। পশুর ও শিবসা নদীর মাঝখানে দ্বীপের মতো এই গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ মানুষ বছরে মাত্র তিন মাস কাজ পান। বাকি সময় এ গ্রাম-ও গ্রাম ঘুরে নানা ধরনের কাজ করে সংসার চালান। বছরে একটি ফসল হয়। তা দিয়ে সাত-আট মাসের খাবারের জোগান হয়। বাকি সময় এক-দুই বেলা খেয়ে কোনোমতে দিন কাটে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিল থেকে জুলাই—এই চার মাস পানির সংকট তীব্র হয়। এ সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩০ ফুট পর্যন্ত নেমে যায়। লোনাপানির আগ্রাসনে অকার্যকর হয়ে পড়ে অধিকাংশ নলকূপ। অথচ এটি কোনো আকস্মিক সংকট নয়। প্রতিবছর একই সময়ে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সংকটের সময় জানা থাকার পরও কেন স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না?

সরকারি পর্যায়ে পুকুর খনন ও বিকল্প পানির উৎস তৈরির প্রকল্প রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালিতে একটি বেসরকারি সংস্থা পুকুরের পানি পরিশোধন করে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে একটি এলাকার এমন উদ্যোগ দিয়ে বিশাল উপকূলীয় জনপদের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা। প্রতিটি পরিবার বা পাড়ায় আধুনিক রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা পৌঁছাতে হবে। বড় পরিসরে লবণাক্ততা দূরীকরণ বা ডি-স্যালাইনেশন প্ল্যান্টও প্রয়োজন।

শুধু পানি নয়, সংকটে কৃষিও

লবণাক্ততা বাড়লে কৃষিই প্রথম বড় ধাক্কা খায়। জমিতে লবণ জমে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। সেচের মিঠা পানিও পাওয়া কঠিন হয়। ফলে কৃষকের সামনে থাকে দুটি পথ। কম উৎপাদন মেনে নেওয়া। অথবা কৃষির ধরন বদলে ফেলা।

একসময় সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ মাঠে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল হতো। এখন অনেক জমিতে মাত্র একটি লবণসহিষ্ণু ধান চাষ সম্ভব। অনেক কৃষক কৃষিজমি চিংড়ি ঘেরে রূপান্তর করছেন। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে মাটির স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

একপর্যায়ে প্রভাবশালী চিংড়িচাষিরা বেড়িবাঁধ কেটে ঘেরে নোনাপানি ঢুকিয়ে বাগদা চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন। তবে মৎস্য অধিদপ্তর চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখে। তাদের মতে, এতে উৎপাদন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ছে।

খুলনা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে খুলনা ও সাতক্ষীরায় নোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ হেক্টর।

লবণাক্ততার প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যেও। পুকুর, খাল ও অগভীর নলকূপের পানি অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারকে টাকা দিয়ে সুপেয় পানি কিনতে হচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বাড়ছে বাস্তুচ্যুতি

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব অভিবাসন। খুলনাভিত্তিক উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট—ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি জানান, তাদের গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৯ সালের পর খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ অন্যত্র চলে যায়। দুই বছর পর ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ ফিরে আসে। বাকি ১৫ হাজার আর ফেরেনি।

গবেষকদের মতে, উপকূলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকে পেশা হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও বেড়িবাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ে। ষাটের দশকে নির্মিত বেড়িবাঁধও অনেক ক্ষেত্রে এই চাপ সামলাতে পারেনি। ফলে কৃষির বদলে চিংড়ি চাষ বাড়ে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ও জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেল—আইপিসিসির গবেষণাতেও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০০৫ সাল থেকে প্রায় দুই বছর পরপর এ অঞ্চলে একটি করে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক দশক ধরে দেশের অর্থনীতিতে গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছরে দারিদ্র্য কমেছে সোয়া ২ শতাংশ হারে। জনসংখ্যা বেড়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। কিন্তু খুলনায় চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সেখানে জনসংখ্যা কমেছে ৬০ হাজার। লবণাক্ত জমিতে ফসল না হওয়াও এর অন্যতম কারণ।

ইউএনডিপি, ডব্লিউএফপি ও বিবিএসের ২০১৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে অতিদরিদ্র মানুষের হার ছিল ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সাতক্ষীরায় এ হার ৫৫ শতাংশ এবং খুলনায় ৫০ শতাংশ।

বেড়িবাঁধে এখনো অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কিন্তু উন্নয়নের নামে তাদের উচ্ছেদের অভিযোগও রয়েছে। হাসান মেহেদির প্রশ্ন, এভাবে চলতে থাকলে উপকূলের মানুষ যাবে কোথায়?

সাতক্ষীরার মানুষের কাছে এখন উন্নয়নের অর্থ শুধু সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো নয়। একটি কলসি নিরাপদ পানির নিশ্চয়তাও উন্নয়ন। তাই উপকূলের জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জীবন-জীবিকা রক্ষায় নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি অভিযোজন।